In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

রমযানের শেষ দশক ও দোয়ার মাহাত্ম্য

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ রাবে (রহ:)

মসজিদ ফযল, লন্ডন, ইউকে

৮ই জানুয়ারী, ১৯৯৯ইং

‘যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনাদের রূহ সিজদাবনত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের দোয়া কবুল হবে না’।

‘নিজেদের গৃহের জীবনের জন্য সদাসর্বদা দোয়া করুন যাতে গৃহে আল্লাহ্‌র এ যিক্‌রের দরুন গৃহ (-এর সবাই) জীবিত হয়ে ওঠে।’

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ

আজ রাত থেকে রমযান মুবারকের আখেরী আশারাহ্ আরম্ভ হচ্ছে। এ দশকটিতে ইতেকাফকারীগণ ঐকান্তিকভাবে আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে তাঁরই ভালবাসায় (আত্মমগ্ন হয়ে) ইতেকাফে বসেন এবং বিশেষভাবে দোয়া করে থাকেন। তবে সর্বাগ্রে আমি সমগ্র জামাতের পক্ষ থেকে দুনিয়া জুড়ে ইতেকাফকারী আহ্‌মদীদের কাছে দোয়ার আবেদন জানাচ্ছি-যে ভাইয়েরা যারা ইতেকাফের বাইরে থাকছি কিন্তু আত্মিক সূত্রে তাতে শামিল রয়েছি তাদেরকেও নিজেদের দোয়ায় যেন স্মরণ রাখেন এবং জামাতের সাধারণ সমস্যাবলীকে সম্মুখে রেখে দোয়া করেন। খোদা করুন, যেন এ ইতেকাফের রাতগুলো কেবল তাদের তকদীরকেই জাগাবার কারণ না হয় বরং জামাতের ও সমগ্র বিশ্বের ইপ্সিত নিয়তিকে জাগাবার কারণ হয়ে যায়। এই ভূমিকার পর আমি ইতেকাফ সম্পর্কিত কিছু বিষয়ও বর্ণনা করবো, যা প্রত্যেক জায়গার মুতাকিফিনদের দৃষ্টিপটে থাকা উচিত। এ বিষয়গুলো সম্পূর্ণই আঁ-হযরত (সাঃ)-এর উপদেশাবলীর উদ্ধৃতিমূলেই বর্ণনা করবো। অতএব, এগুলোর ওপরে বাহ্যিকভাবেও এবং রূহ্ ও অন্তর্নিহিত মর্মের দিক দিয়েও পুরোপুরি আমল হওয়া উচিত।

এখন, এই দিনগুলো খাস কবুলিয়তের দিন, বিশেষভাবে দোয়া করার দিন এবং রমযান-মুবারকের মেরাজস্বররূপ এ শেষ দশকটি। এর মাঝেই একদিন লাইলাতুল কদর এর রাত্রিও হবে। এ আশারার প্রত্যেক রাতে বান্দাদের জন্য আল্লাহ্‌ তাআলার বিশেষভাবে ঝোঁকার এবং তাদের দোয়া কবুল করার উল্লেখ পাওয়া যায়। সুতরাং যে আয়াতটি আমি তিলাওয়াত করেছি এতে বিশেষতঃ সে বিষয় বস্তুই বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ দোয়ার ওপর সামগ্রিক আলোকপাত সম্বলিত এতোই মহান এ আয়াতটি যে, তা লক্ষ্য করে মানবীয় জ্ঞান বুদ্ধি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে। দোয়া এবং ঐশী নৈকট্যের কোনও দিক তাতে বাদ পড়েনি। এর প্রত্যেকটি দিকে এরূপ আলোকসম্পাত এতে বিদ্যমান যে, মানুষ যদি তাতে একটু গভীরভাবে চিন্তা করে তাহলে এরপর দুনিয়ার কোন নাস্তিকের সামনে নত হবার কোনও অবকাশ আর থাকে না।এ বিষয়ে আয়াতটিতে এতই অকাট্য ও চিরস্থায়ী যুক্তি প্রমাণ নিহিত রয়েছে যে, সার্বিকভাবে এই সব বিষয় একই খুতবায় বর্ণনা করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে এ আয়াতের তফসীর বা ব্যাখ্যায় বিদ্যমান কতক বিষয় আমি বিশদভাবে তুলে ধরবো এবং এরই বিষয় বস্তুকে ঘিরে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আঃ)-এর বহু উদ্ধৃতির মধ্যে কয়েকটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো। যদি সময় না বাঁচে তাহলে আগামী খুতবায়ও এ বিষয়টিই অব্যাহত থাকবে। প্রথম বিষয়টি হচ্ছে “ইযা সায়ালাকা ইবাদী আন্নী ফাইন্নী ক্বরীব”-মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেছেন, যখন তোমার কাছে আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে “ফাইন্নী ক্বারীব” তখন (বল) নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকটে রয়েছি। ‘ক্বরীব’ (নিকটে) এর বহুবিধ অর্থ বর্ণিত রয়েছে কিন্তু একটি অর্থ যা আমি মনে করি সম্পুর্ণ সঠিকও সত্য এবং আয়াতের পূর্বাপর বিষয়ের সাথে হুবুহু সঙ্গতিপূর্ণ -এতে কোন রায়ের এতটুকুও আমল বা দখল নেই, বরং এ আয়াত এমনটি-ই বলছে। এখানে রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নৈকট্য বুঝায়। তাঁর নৈকট্যের দরুন খোদা নিকটে। অতএব, যে-বান্দারা মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর কাছে খোদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তারা কি আঁ-হযরত (সাঃ)-কে অবলোকন করছে না যে, তাঁর মাঝে খোদা কথা বলেন! সুতরাং এ দিক দিয়ে এ একটি মহান আয়াত!! তারা তোমার নিকট প্রশ্ন করে যে, খোদা কোথায়? তাদের দেখিয়ে দাও, তুমি সেই ব্যক্তি যার মধ্যে খোদা বিদ্যমান, তোমার মাঝে খোদা সবাক। আর এর প্রমাণ আয়াতটির পরবর্তী অংশে পেশ করা হচ্ছে। “উজীবু দা’ওয়াতাদ্ দায়ি ইযা দাআনি”- প্রথম প্রমাণ হলো এই যে, তোমার দোয়া গৃহীত হয়নি এমন কি কখনও হয়েছে? আল্লাহ্ রদ করেছেন এমন কোন দোয়া আছে কি তোমার ? অতএব, তুমি (সাঃ) প্রমাণস্বরূপ খোদাতাআলার অস্তিত্ত্বের এবং এ বিষয়ের যে, যে-দোয়া তুমি কর এবং যে ধারায় তুমি দোয়া করে থাক ঐ দোয়াসমূহ অবধারিতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। কাজেই ‘উজীবু দা’ওয়াতাদ দায়ি ইযা দায়ানি’-এ আয়াত থেকে এ সন্দেহের উদ্রেক হয় যে, যেন -তেন প্রত্যেকের দোয়া বুঝায় এবং যেন-তেন বলতে পারে সে অনেক দোয়া করা সত্ত্বেও তার দোয়া তো কবুল হয়নি এখানে এর প্রকৃষ্ট অপনোদন রয়েছে। কেননা, ‘দায়ী’ (প্রার্থনাকারী) বলতে এখানে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে বুঝায় আর আমার মতে এর প্রথম ও প্রধান অর্থ এটাই। অর্থাৎ ‘এই প্রার্থনাকারী হযরত মুহাম্মদ রসুল্লাহ্‌র দোয়া আমি শ্রবণ করি যখন সে আমাকে ডাকে, আমি তার পাশে থাকি।’ এরপর সন্দেহের আর কী অবকাশ থেকে যায়? বস্তুতঃ সমস্ত দুনিয়ার জন্যে খোদাতাআলার অস্তিত্ত্বের এটা এক অকাট্য-অখন্ডনীয় প্রমাণ।

আঁ-হযরত (সাঃ)-এর তো কেয়ামত অবধি সর্বকালের জন্যে সকল দোয়া আল্লাহ্ কবুল করেছেন এবং তাঁর ঐ সকল দোয়ারই ফল যে, আল্লাহ্‌ তাআলার অনুগ্রহক্রমে ইসলাম দৈন��্দিন নিত্য নূতন সফলতা লাভে সৌভাগ্যমন্ডিত হয়ে চলেছে। প্রত্যেক যুগেই আঁ-হযরত (সাঃ)-এর দোয়াসমূহ, এর সাক্ষী যে আল্লাহ্ বিদ্যমান এবং তিনি সবার চেয়ে মুহাম্মদ রসুল্�����হ্‌র খোদা।

অতএব খোদাকে যে দেখতে চায় সে কাছে থেকে দেখে নিক, মুহাম্মদ (সাঃ)-এর তার জন্যে খোদা পরিদৃষ্ট হবেন। একথাই হযরত মসীহ্ মাওউদ (আঃ) বলেছেন যে, আঁ-হযরত (সাঃ)-এর সত্তায় আমরা আল্লাজাল্লা শানহুকে আলোকসম্পাতরত (অবস্থায়) দেখতে পাই। তাঁর আলোকসম্পাতের জন্যে অন্য কোনও প্রমাণের প্রয়োজন নেই। স্বয়ং মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সত্তা প্রমাণ করছে যে, খোদাতাআলা তাঁর (সাঃ) সত্তায় জ্যোতির্বিকাশ করছেন। অতএব, ‘উজীবু দাওয়াতাদ দায়ি ইযা দায়ানী’-মুহাম্মদ রসূলূল্লাহ্ যখনই আমাকে ডাকেন তখন তাকে কখনও নিরাশ করিনি আমি।

“ফাল্ ইয়াস্তাজীবূলী”-মানুষের জন্যে আদেশ এই যে, তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় যেভাবে সাড়া দিয়েছেন মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)। তাহলে তাদের সাথেও তদ্রুপ ব্যবহারই করবো। “ওয়াল ইউমিনূবী”-এর প্রকৃত মর্ম অত্র পূর্বাপর সূত্রে এই দাঁড়ায় যে, তারা যেন তদ্রুপ ঈমান আনে যেরূপ ঈমান এনেছিলেন মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)। কেবল দূরে বসে ঈমানের দাবি উচ্চারণ করা তো সম্পূর্ণই বৃথা। প্রকৃত ঈমান হচ্ছে যা “ইস্তেজাবত” (-আল্লাহ্‌র সমস্ত ডাকে সাড়া দান) এর পরবর্তী ঈমান হয়ে থাকে। আল্লাহ্‌র সব কথা গ্রহণ করো তারপরেই ঈমানের কথা বলো। আল্লাহ্‌র আদেশ গ্রহণ পালন ব্যতিরেকে কি করে ঈমানের কথা বলতে পার? আর যে, আল্লাহ্‌র কথা গ্রহণ করে না, সে আল্লাহ্‌র নিকটেও নয়। আর যে আল্লাহ্ থেকে দুরে থাকে, আল্লাহ্ কী করে তার নিকটে হতে পারেন?

অতএব আয়াতটিতে এক অদ্ভূত ও বিস্ময়কর বাক-ভঙ্গীতে বর্ণিত হয়েছে যে, নৈকট্যের দোয়াতো আমি অবশ্য শ্রবণ করে থাকি তবে তোমরাও তো আমার নিকটে থাকো; তোমরা তো দূরে বসে আছো -নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছো; অতএব, আমিও দূরে আছি। বস্তুতঃ আল্লাহ্‌র গুণাবলীর এই বৈশিষ্ট্য যে, তিনি একই সময়ে সবচে’ নিকটে, আবার সবচে’ দূরে। এতো দূরে যে, কল্পনাও তা নাগাল পায় না। কাজেই তোমরা দোয়া কবুলের কথা তো বল কিন্তু নিজেরা দূরে সরে থাক। অর্থাৎ প্রকারান্তরে আল্লাহ্ (এ আয়াতটিতে) বলছেন, আমার কথায় যখন তোমরা সাড়া দাওনা তখন তাতে প্রতীয়মান হয় যে, তোমরা অনেক দূরে সরে বসে আছ, বধির হয়ে গিয়েছ-বুঝতে পারছনা আমি তোমাদের কি বলছি আর (এমতাবস্থায়) যখন তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা কর তখন মনে কর আমি যেন তোমাদের নিকটে এসে পড়ি। তা হতে পারে না। ঐ সুন্নতই অনুসরণীয় যা মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর আচরিত সুন্নত। আল্লাহ্‌ তাআলা এক মুহূর্তও তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যাননি। [কেননা তিনি (সাঃ) সবসময় আল্লাহ্‌র প্রত্যেক কথায় সাড়া দেওয়ায় নিজে তাঁর কাছে থেকেছেন]। আর একারণেই প্রতি মুহূর্তই আল্লাহ্ তাঁর দোয়া শুনতেন।

“লাআল্লাহুম ইয়ারশুদূন”-যদি তোমারা ‘হেদায়াত’ (সঠিক পথ ও সফলতা) লাভ করতে চাও তাহলে এর জন্যে এটাই নির্ধারিত পন্থা। এখন রমযানের যে বিশেষ রাতগুলো আসছে এগুলোতে উক্ত পন্থায় পরিচালিত হতে হবে। যদি তদ্রুপ কর, আল্লাহ্ নির্দেশিত ঐ পন্থায় সাধানা কর, তাহলে “লাআল্লাহুম ইয়ারশুদূন” আল্লাহ্‌র এই ওয়াদা অনুযায়ী তাঁরই অনুগ্রহক্রমে তোমরা সবাই হেদায়াত লাভের সৌভাগ্যে ভূষিত হবে।

এই হেদায়াত লাভের সৌভাগ্য কিভাবে ঘটবে? এই ঐশী ওয়াদা কীভাবে পুর্ণ হবে? এ প্রসঙ্গে কিছু কথা এখনই আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করছি। তবে পূর্ব ওয়াদা অনুযায়ী সর্বাগ্রে আমি আঁ-হযরত (সাঃ)এর আখেরী আশারাহ্ সম্পর্কিত কিছু হাদীস পেশ করছি যার মাঝে এসব বিষয়ের উত্তর এসে যায়-‘লাআল্লাহুম ইয়ারশুদূন’ দ্বারা কী কী বিষয় বুঝায়? কীরূপে তোমরা হেদায়াত লাভ করতে পার? এই দশ রাত্রের দ্বারা কীভাবে উপকার লাভ করতে পার? এতদসক্রান্ত সকল পথ ও পন্থা আঁ-হযরত (সাঃ)-এর পবিত্র সুন্নত ও উক্তি থেকে স্পষ্টতঃ প্রতিভাত হয়।

হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে হযরত নবী করীম (সাঃ) বলেন,

সৎকর্মশীলতার দিক দিয়ে আল্লাহ্‌র দৃষ্টিতে রমযানের শেষ দশকের চেয়ে মহৎ ও প্রিয় আর কোন দিন নেই। (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল, ২য় খন্ড, ৭৫ পৃষ্ঠা)

অর্থাৎ এই দশকে আল্লাহ্‌ তাআলা অন্যান্যদেরকে মাহাত্ম দান করেন। নইলে, কোন দিন বা রাত আল্লাহ্‌র কাছে কী করে মহান হতে পারে? মহান এ দিক দিয়েই যে, এই দশকে আল্লাহ্‌র সংস্পর্শে যারা আসে তাদেরকে এটা মহানে পরিণত করে। মহান আল্লাহ্‌র সঙ্গে সম্পর্ক যতো নিবিড় হবে যতো বৃদ্ধি পাবে, বান্দাও ততো মহানে পরিণত হতে থাকবে। এতদুদ্দেশ্যে রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এই দশকে বহুল মাত্রায় ‘তাহ্‌লীল’, ‘তাকবীর’‘তাহ্‌মীদ’ করতে উপদেশ দান করেন। তাহ্‌লীল মানে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ অর্থাৎ আল্লাহ্‌র তওহীদের স্বীকৃতি সম্বলিত যিকর, তাকবীর মানে ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থাৎ আল্লাহর সর্বব্যাপী মাহাত্মের স্বীকৃতি সম্বলিত যিক্‌র এবং তাহ্‌মীদ মানে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ আল্লাহ্‌র সার্বিক প্রশংসার স্বীকৃতি সম্বলিত যিক্‌র রাত-দিন অধিক মাত্রায় আবৃত্তি করতে উপদেশ দান করেন। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ উঠতে বসতে, শুয়ে জেগে, মুখে-অন্তরে আবৃত্তি করতে থাকা উচিত, হৃদয় যাতে স্পন্দিত হয় এবং মানুষ উপলব্ধি করে যে, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। এ সত্যটি খাঁটি অন্তরে যখন সে অনুভব করে তখন তকবীর আপনা-আপনি তা থেকে ফুটে ওঠে-‘আল্লাহু আকবার’ - ‘আল্লাহ্ই সবচে’ বড়। তিনি এক-অদ্বিতীয় এবং সবচে’ বড়-এই দুটো কথার মাঝে তো আপাতঃ যেন স্ববিরোধও প্রতীয়মান হয়। যখন এক অদ্বিতীয় , তখন সবচে’ বড় এর অর্থ কী? অর্থ, একমাত্র তিনিই, সমস্ত বড়াই ও মাহাত্ম তাঁরই। অবশিষ্ট অন্য সব জিনিস তো কোনও মূল্যই রাখে না। এমনি চোখের বিভ্রমস্বরূপ যা দুনিয়াতে পরিদৃষ্ট হচ্ছে। একমাত্র আল্লাহ্‌রই শ্রেষ্ঠতার শীর্ষ মর্যাদা সব কিছুতে উদ্ভাসিত হতে পরিলক্ষিত হয়। তবেই কিনা তওহীদের সঠিক সত্যিকার জ্ঞান লাভ হতে পারে। যদি কারও কাছে তদ্রুপ উদ্ভাসিত না হয়, তবে এসব চোখের বিভ্রম বৈ আর কিছু নয়। অতএব, ‘আকবর’ একমাত্র সেই খোদা, সমগ্র বিশ্ব জগতের যিনি মালিক। ‘তাহ্‌লীল’-এর দ্বারা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠতা আপনাদের উপর সমুজ্জ্বল হবে। আর যারা তাঁর একনিষ্ঠ বান্দায় পরিণত হন যিনি সবচে’ মহান সেই আল্লাহ্‌ তাআলার পক্ষ থেকে অবধারিতভাবে তাদেরকে সেই মাহাত্ম ও মহানত্ব লাভের সৌভাগ্য দান করা হয়, যা খোদার গোলামদেরকেই দান করা হয়ে থাকে-যে মহানত্ব আঁ-হযরত (সাঃ)-কে সবচে’ বেশি দান করা হয়।

উক্ত দু’টো বিষয়ের দরুন হৃদয় থেকে স্বতঃস্ফূর্তরূপে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। যখন মানুষ খোদাতাআলার তওহীদকে প্রত্যক্ষ্যভাবে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে স্বীকার করে এবং এর ফলশ্রুতিতে খোদাতাআলার পক্ষ থেকে মহত্ব তার ভাগ্যে ঘটে যা কেবল তাঁর একনিষ্ঠ দাসগণই পেয়ে থাকেন তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার বা তাদের অন্তর থেকে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ প্রস্ফুটিত হয়। “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্যে”-এ বাক্যে দু’টি দিক নিহিত আছে। এক, নিজের সত্তার দিকে যেন বান্দার দৃষ্টি না যায়-এই খেয়াল যেন না হয় যে, আহা! আমিও বড় কিছু হয়ে গেলাম। তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিকার হবে ‘আল্ হাম্দ’-এর দ্বারা ‘না, না, প্রশংসারাজী তো কেবল আল্লাহ্‌রই। আমরা তাঁর কিছু খয়রাতস্বরূপ পেয়েছি; আমাদের তো মূলতঃ কিছুই নয়।’ দ্বিতীয়তঃ ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ গভীর কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন-সূচক কলেমায় বা প্রবচনে পরিণত হয়েছে। আঁ হযরত (সাঃ)-এর সময় থেকে চলে আসছে যে, যখন ভাল কোন সংবাদ পাওয়া যায় তখন মুখ থেকে অবলীলায় ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ নিঃসৃত হয়। কাজেই, উল্লেখিত উভয় অর্থে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’র আবৃত্তি এ দিনগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

আরেকটি হাদীসে হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে,

আঁ-হযরত (সাঃ) রমযানের শেষ দশকে অত্যধিক মুজাহাদা (সাধনা) করতেন, এতো যে ঐ দিনগুলো ব্যতীত অন্যান্য দিনে ততো মুজাহাদা করতেন না। (সহী মুসলিম, কিতাবুল ই’তিকাফ)

অতএব, এর প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী আহ্‌মদীদের উদ্দেশ্যে আমার নসীহত হলো, গাফিলতি যদি আগে হয়ে থাকে তা পরিহার করুন এবং এখন এই দশকের মুজাহাদায় আত্মনিয়োগের জন্যে নিজেরা তৈরী হয়ে নিন।

আবু মূসা (রাঃ) বর্ণিত এ হাদীসটি রয়েছে যে,

(একদল সাহাবাসহ) আঁ-হযরত (সাঃ) কোন এক সফরে ছিলেন তখন মানুষ জোরে জোরে তকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করতে থাকলেন। তাতে হুযূর পাক (সাঃ) বললেন, হে জনগণ! মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন কর, তোমরা তো কোন বধিরকে আহ্বান করছো না এবং এমন কাউকেও না যিনি নিকটে উপস্থিত নন। তোমারা বস্তুতঃ আহ্বান করছো তাঁকে, যিনি ‘সামী’ (সর্বশ্রোতা) এবং তাঁকে যিনি হচ্ছেন ‘ক্বারীব’ (নিকটে উপস্থিত)।” (মুসলিম, কিতাবুয যিক্‌র)

এখন এই উপদেশটি থেকে আমরা ঐশী নৈকট্যের অর্থও জানতে পারলাম যে, আল্লাহ্‌ তাআলা আঁ-হযরত (সাঃ)-এর পাশাপাশি, তাঁর সাহাবাদেরও নিকটে ছিলেন। অনেক বড় ধরনের সুসংবাদ এটা সাহাবাদের জন্যে। তাঁরা তাঁকে ডাকছেন যিনি হচ্ছেন তাদের নিকটে। মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ও ছিলেন নিকটে, যাঁর মাঝে আল্লাহ্ ছিলেন বিরাজিত। আর মুহাম্মদ রসূলুল্লাহর মাধ্যমে, তাঁর কল্যাণ প্রসাদে সাহাবাগণও ছিলেন খোদার নিকটে এবং তাদের মধ্যেও খোদা আলোকসম্পাত করেছিলেন। অতএব আল্লাহ্ যেহেতু সর্বশ্রোতা এবং ‘ক্বারীব’ (নিকটে উপস্থিত), সেহেতু অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তাঁকে ডাকো। উঁচু আওয়াজে তাঁকে ডাকা জরুরী নয়। কোন কোন সময় রসূলুল্লাহ (সাঃ) তকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেছেন কিন্তু খোদাকে শোনাবার জন্যে নয়, বরং এরূপ মানুষদের শোনাবার জন্যে, যাদের ওপর তকবীরের প্রতাপ ও প্রভাব আরোপ করা আবশ্যকীয় ছিল। অতএব, ঐরূপ ক্ষেত্রে তকবীর ধ্বনি সজোরে উচ্চারিত হয় তাদেরকে শোনাবার উদ্দেশ্যে যারা হয়ে থাকে আল্লাহ্‌র যিক্‌রের প্রতি বধির-স্বরূপ, যাতে তকবীরের ছোঁয়া তাদের হৃদয়ে লাগলে তাদের সুপ্ত হৃদয় জেগে ওঠে। হয়ত এর কষাঘাতে আল্লাহ্‌ তাআলার যিক্‌র তাদের অন্তরে প্রবেশ করতে পারে।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীস হচ্ছে,

যখন রমযান শেষ দশকে প্রবেশ করতো বা শেষ দশক শুরু হতো, তখন আঁ-হযরত (সাঃ) কোমর বেঁধে তাতে আত্মনিয়োগ করতেন, তাঁর রাতগুলোকে জীবিত করতেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকেও ইবাদতের জন্যে জাগাতেন। (‘বুখারী, কিতাবুস সওম’)

পরিবার-পরিজনকে জাগানো তো তাঁর সব সময়ের সাধারণ রীতি ছিল এবং তাঁর রাত্রিগুলোও (ইবাদতে) জীবিত-ই থাকতো। এই হাদীস থেকে অধিকতর চেষ্টা-প্রয়াস এবং অধিকতর মনোনিবেশ প্রমাণিত হয়। অতএব, যারা আগে থেকে তাহাজ্জুদগুজার রয়েছেন তাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, এই দশ রাতের তাহাজ্জুদের মধ্যে নুতন কোন বৈশিষ্টের সৃষ্টি হওয়া উচিত, যা তাদের পূর্বে আদায়কৃত তাহাজ্জুদে ছিল না। কেননা, রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর তহাজ্জুদ নামাযে যাবতীয় এ রকম বৈশিষ্ট্যই ছিল তা সত্ত্বেও তিনি (সাঃ) ঐ রাতগুলোতে বিশেষ সাধনা করতেন এবং এ কারণে খোদাতাআলার এই ওয়াদা যে, ‘ইন্নি ক্বরীব’ তা হচ্ছে নিকটে হওয়া সত্ত্বেও আরও নিকটে হবার ওয়াদা। এর কী অর্থ? এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্‌র নৈকট্য অনন্ত-অসীম। এই ধারণা মন থেকে বের করে দেয়া উচিত যে, ‘আমরা আল্লাহ্‌র নিকটে হয়ে গিয়েছি, এ-ই যথেষ্ট হয়েছে।’ রসূলুল্লাহ (সাঃ)-ও আল্লাহ্‌র এরূপ নিকট হননি যে, এর পরে আরও নিকটে যাওয়া আর সম্ভব ছিল না। সেরূপ যদি হতো তাহলে আঁ-হযরত (সাঃ)-ও স্থবির এবং খোদাও স্থবির হয়ে যেতেন। অথচ যে খোদা মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ওপর আলোক-সম্পাত করেছেন সে-খোদা কখনও স্থবির নন, একই জায়গায় তিনি থেমে নন। নৈকট্যেও তিনি অগ্রসর হয়ে থাকেন। আর মানুষ যখন ভাবে যে, এর চে’ বেশি নৈকট্য কি সম্ভব নয় তখন সে আরও নৈকট্যের দৃশ্য অবলোকন করে থাকে। বস্তুতঃ আঁ-হযরত (সাঃ) এহেন নৈকট্যে সদা অগ্রসরমান থাকেন। কেউ বলতে পারেনা যে, নৈকট্যে কোনও মার্গে পৌঁছার পর তিনি সেখানে থেমে গিয়েছিলেন। অতএব, সেজন্যেই আল্লাহ্‌ তাআলা আঁ-হযরত (সাঃ)-কে অধিকতর নৈকট্যের ওয়াদা দিতে থাকেন। এ ক্ষেত্রে অবশিষ্ট অন্যান্য যতো তাহাজ্জুদগুজার ও খোদার পথের সন্ধানী যারা রয়েছেন তাদের জন্যে এ বিষয়টিতে বড় ধরনের উপদেশ নিহিত রয়েছে, তারা যেন ঐশী নৈকট্য সন্ধানে আরও সচেষ্ট হন।

কোনও এক পর্যায়ের নৈকট্যের কথা ভেবে সেখানে থেমে যাওয়া যথেষ্ট নয়। এটা পার্থিব প্রেমিকদের কাজ যে, তারা পরস্পর ঘনিষ্ট হতে হতে কোন এক জায়গায় গিয়ে থেমে যায়। আর যেখানে থেমে যায় সেখান থেকেই তাদের প্রেম মরতে শুরু করে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পক্ষান্তরে, আল্লাহ্‌র প্রেম চিরস্থায়ী, এবং তাঁর নৈকট্যের পথে এমন কোন মার্গ নেই যেখানে আপনারা থেমে যাবেন আর তখনই প্রেম ম্রিয়মাণ হতে শুরু করবে। সুতরাং এই সব বিষয়-বস্তু আঁ-হযরত (সাঃ)-এর এ সুন্নতটির অন্তর্ভূক্ত যে, (আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের পথে) তিনি তাঁর কোমর বেঁধে আত্ম-নিয়োজিত হতেন। যেমন কেউ পরিশ্রমের কাজের জন্যে তাঁর কোমর বন্ধন কষে বেঁধে নেয়। এটাকেই আরবী ভাষার বাগধারায় কোমর বেঁধে নেওয়া বলা হয়। অতএব আঁ-হযরত (সাঃ)-ও ওরূপই কোমর কষে বেঁধে নিতেন (আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভে সদা অধিকতর অগ্রসরমান হবার উদ্দেশ্যে)।

তাঁর ইতেকাফে বসার যদ্দুর সম্পর্ক সে-প্রসঙ্গে হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণিত এ হাদীসটি আমাদের পথপ্রদর্শন করছে।

রমযানের শেষ দশকে রসূলুল্লাহ (সাঃ) ইতেকাফ করেন। তাঁর জন্য খেজুরের শুকনো ডাল-পাতা দিয়ে হুজরা (কক্ষ) নির্মাণ করা হয়। (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল)

স্মরণ রাখবেন যে, ঐ যুগে মসজিদ-নববী আয়াতনের দিক দিয়ে এতো বড় বিস্তৃত ছিল যে, বর্তমানকালের মসজিদগুলোতে আপনারা তা ভাবতেও পারেন না। অনেক বিশাল ব্যাপক মসজিদ-নববী। সেখানে জায়গায় জায়গায় পৃথক তাবু স্থাপন করা হতো। আলাদা আলাদা হুজরা তৈরী করা হতো এবং সাধারণতঃ একজনের আওয়াজ আরেকজনের নির্জনতায় ব্যাঘাত ঘটাবার কারণ হতো না। এ-ই চলমান রীতি ছিল।

হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন,

একদিন তিনি (সাঃ) কক্ষের বাইরে উকি দিয়ে বললেন, এখন সকল ই’তেকাফকারী মনোযোগ দিয়ে শুনে নিন। তিনি কী বললেন, নামাযী তার প্রতিপালক প্রভুর কাছে আকুতি-মিনতি এবং প্রেম নিবেদনে আত্মমগ্ন হয়ে থাকে সেজন্যে একে অন্যকে শোনাবার উদ্দেশ্যে ‘কিরায়াত বিল জাহ্‌র, (উঁচু কন্ঠে তিলাওয়াত) করো না।

হাদীসটির ভাষ্য হচ্ছে “লা ইয়াহ্‌জার বা’যুকুম আলা বা’যিন বিল কিরায়াতি” অর্থাৎ এর দু’টো অর্থ করা যেতে পারে-‘নিজের কিরায়াতের দ্বারা আরেকজনের কিরায়াতে যেন ব্যাঘাত না ঘটায়’। আরেকটি প্রচলিত অর্থ হচ্ছে ‘কাউকে শোনাবার উদ্দেশ্যে’। তবে সাধারণতঃ ই’তেকাফে বসার যে রীতি রয়েছে সেক্ষেত্রে আমরা কখনও শুনিনি যে, কেউ তার কোন হুজরায় বসে আন্য কাউকে শোনাবার জন্যে কুরআন পাঠ করে। এ তো কোন কুরআন ক্লাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। কিন্তু অপরদিকটি-ই সঠিক যে, যদি কেউ উঁচু আওয়াজে তেলাওয়াত করে তাহলে সে অন্যের তিলাওয়াতে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে। আর এগুলো হচ্ছে আল্লাহ্‌র সঙ্গে একাগ্রচিত্তে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার রাত। তাতে কারো এই অধিকার নেই যে, কুরআন তিলাওয়াতের দ্বারাই হোক না কেন নিবিড় চিত্ততার এই নির্জন মুহূর্তগুলোতে কোনও ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এখন রসূলূল্লাহ্ (সাঃ) যে তাঁর তাঁবু থেকে বের হয়ে এ কথাটি বললেন তাতে দুটি বিষয় সুনিশ্চিত। এক, আঁ-হযরত (সাঃ)-এর কিরয়াতের আওয়াজ অন্যান���য তাঁবু পর্য���্ত পৌঁছাত না, যদি পৌঁছত তাহলে ঐ নসিহত তিনি করতেই পারতেন না। কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি তাঁর চেয়ে বেশি ভালবাসা আর কার-ই বা হতে পারে? তাঁর তিলাওয়াতের আওয়াজ তো তাঁবুর আওতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে আর অন্য কোনও তাঁবুর আওতায় ব্যাঘাৎ সৃষ্টি করে না কিন্তু অন্যদের আওয়াজ এসে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে-তা তখনই সম্ভব যে, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর তাঁবু পর্যন্ত আওয়াজ এসে পৌঁছতো। সুতরাং তিনি তা শ্রবণ করেন এবং অপসন্দ করেন এবং অন্যান্যদের জন্যেও এইসূত্রে এক রকম নিরাপত্তার বিধান করেন যে, প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার রয়েছে আল্লাহ্‌ তাআলার সঙ্গে নির্জন নিবিড় চিত্ততার ব্যাপারে সে যেন পৃথক এবং গোপন থাকে। অন্য কেউ যেন তার ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ না হয়। উল্লেখিত বিষয়টি যেন আমাদের মু’তাকেফীন দৃষ্টিপটে রাখেন। অনেক সময় এরূপ হয়ে থাকে যে, তাঁরা তাদের ইবাদত করার সময়ে, গিরিয়াযারির সময়ে অথবা তিলাওয়াত করার সময়ে এসব কথা ভুলে যান আর এর ফলে সব সময় আপত্তির সৃষ্টি হতে থাকে।

এখন, একটি হাদীস ‘আবূ দাউদ, কিতাবুস সালাত’ থেকে নেয়া হয়েছে। হযরত ফাযালা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত যে, আঁ-হযরত (সাঃ) এক ব্যক্তিকে নামাযে দোয়া করতে শ্রবণ করলেন, সে আল্লাহ্‌ তাআলার হাম্‌দ ও সানা করেনি এবং নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতি দুরূদও পাঠায়নি। অতএব, যারা তাদের দোয়াসমূহকে মকবুল (গ্রহণযোগ্য) করে তুলতে চান তাঁরা এই নসীহতটি মনোযোগ সহকারে শুনে নিন যে, রমযানের দোয়াসমূহ গৃহীততো হবে কিন্তু আগে তসবীহ্, তাহ্‌মীদ ও দুরূদ পাঠ করা আবশ্যকীয়। এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, সে তাড়াহুড়া করেছে অর্থাৎ ত্বরিৎ সে তার ঈপ্সিত কথায় চলে এসেছে এবং ভুলে গেছে যে, যে পথ ধরে তার স্বার্থের কথা বলা উচিত ছিল যার দরুন সে সফলকাম হতে পারতো তা সে অবলম্বন করতে বিস্মৃত হয়েছে। সে short cut করে তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছবার চেষ্টা করেছে। শর্ট করতে গিয়ে মানুষ কোন সময় আবার পদস্খলিত হয়ে থাকে, উদ্দেশ্য হাসিলেই ব্যর্থ হয়। প্রত্যেক জিনিসেরই একটা ধারা ও কর্ম-পদ্ধতি নির্ধারিত আছে।

রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, তোমরা যদি নিজেদের দোয়াকে কবূল করাতে চাও তাহলে এই পদ্ধতি অবলম্বন কর। সে পদ্ধতিটি কী? রসূলুল্লাহ্ তাকে ডাকলেন এবং তাকে অথবা সে ব্যতীত অন্য কাউকে বললেন তবে সে-ও শ্রবণ করছিল, “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ দোয়া চায় তখন সে যেন তার প্রভু আল্লাহ্‌র হাম্‌দ ও সানা করে। এতদ্ব্যতীত কখনও যেন সে দোয়া না চায়। তারপর নবী করীম (সাঃ)-এর ওপর যেন দুরূদ পাঠায়।” হাদীসটির ভাষ্য হচ্ছে- “সুম্মা ইউসাল্লি আলান নাবীয়ে” আর সেই সঙ্গে “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম”-ও বলেন। এখানে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে পৃথক করে আমাদের উদ্দেশ্যে “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাম” শব্দগুচ্ছ উচ্চারণ করেন। আসল রিওয়ায়াতে হুবহু ওরূপেই লিপিবদ্ধ আছে। তারপর বলেন “সুম্মা ইয়াদউ বা’দু মা শা’য়া”-এর পর যা ইচ্ছা দোয়া করুক। “যো দোয়া কিজিয়ে কবুল হ্যয় আজ” ধরনের ব্যাপারে হবে। তখন যে দোয়াই করা হোক তা গ্রহণযোগ্য দোয়া হবে।

আঁ-হযরত (সাঃ) দোয়ার কবুলিয়ত সম্পর্কিত বিশেষ একটি মওকার কথা উল্লেখ করেছেন যখন দোয়া বেশি কবুল হয়ে থাকে। সে মওকাটি! কী তা হচ্ছে সিজদার অবস্থা। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে,

আঁ-হযরত (সাঃ) বলেন, মানুষ তার প্রতিপালক প্রভুর সবচে’ নিকটে হয় তখন, যখন সে সিজদায় থাকে সেজন্যে তখন অনেক দোয়া করো। (মুসলিম কিতাবুস সালাত বাবু মা ইয়াকুলু ফিররুকূয়ে ওয়াস সাজুদ)

এখন, এ হাদীসটি অন্যান্য কোন কোন হাদীসের সাথে আপাতঃ দৃষ্টে এক বিরোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। হযরত আয়েশা ও অন্যান্য উম্মাহাতুল মু’মিনীন এবং সাহাবাগণ বর্ণিত কতিপয় রিওয়ায়াতে উল্লেখ রয়েছে যে, কোন কোন সময় রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) প্রায় সারা রাত খোদার সমীপে দন্ডায়মান অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন, এমন কি তাঁর পা ফুলে যেতো। এখন, সিজদার অবস্থা এবং কিয়াম বা দন্ডায়মান অবস্থার মাঝে এ প্রসঙ্গে পার্থক্য কী? তা আমি বোঝাতে চাই যে, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) প্রকৃতপক্ষে তখনও সিজদার অবস্থাতেই হতেন। আসল সিজদা হচ্ছে রূহের সিজদা। বাহ্যিক সিজদাও ঐশী নৈকট্যের এক প্রতীকি চিহ্নস্বরূপ হয়ে যায়। তাছাড়া রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সিজদাগুলোও সুদীর্ঘ হবারও উল্লেখ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু বেশির ভাগ বর্ণনায় রাত্রিকালে সুদীর্ঘ কিয়ামের উল্লেখ অবশ্যই পাওয়া যায়। অতএব, এই ধারণা গ্রহণ করা যে, সিজদা একটি পৃথক অবস্থা ছিল এবং কিয়াম ভিন্ন এক অবস্থা ছিল তা এজন্যে সঠিক নয় যে, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর আত্মা বা রূহ কখনও সিজদা থেকে পৃথক হয়নি। সুতরাং তাঁর রূহ্ সিজদাবনত থাকতো যদিও কিনা দেহ দন্ডায়মানই হতো। আর রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, সিজদার অবস্থায় আল্লাহ্ নিকটতর হযে থাকেন। অতএব, আল্লাহ্ তাঁর (সাঃ) অধিকতর নিকটে ছিলেন। যদিও বা নামাযে তিনি দন্ডায়মান অবস্থায় থাকুন অথবা বাহ্যিকভাবে সিজদারতই হোন। অতএব, এ বিষয়টি স্মরণ রাখবেন যে, যতোক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের রূহ সিজদাবনত না হয় ততোক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের দোয়াসমূহ কবুল হবে না। দোয়া কবুল হবার আরেকটি পদ্ধতি আঁ-হযরত (সাঃ) বর্ণনা করেছেন। তা হচ্ছে বর্তমান দিনকালের আগেই বর্তমান দিনকালের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আজ আমরা চাই যেন আমাদের দোয়া কবুল হয়। আর তেমনি বিপদ-মসিবতের সময়ও আমরা চাই আমাদের দোয়া যেন কবুল হয়। আঁ-হযরত (সাঃ) বলেন,

“যখন সচ্ছলতার দিন থাকে যখন তোমাদের বিশেষ কোন প্রয়োজন বা অভাব অনটন থাকে না, তখন আল্লাহ্‌র সমীপে উপস্থিত হও এবং মুনাজাত করো। তাহলে এরূপ কখনও হতে পারে না যে, তোমাদের প্রয়োজনের সময়ে আল্লাহ্ তোমাদের ভুলে যান।”

অতএব, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর দিনগুলো (রমযানের শেষ দশক) বিশেষ কবুলিয়তের দিন-স্বরূপ এবং ঐশী নৈকট্যের দিন-স্বরূপ এজন্যে ছিল যে, তাঁর সাধারণ দিনকালও তদ্রুপই ছিল। কখনও তাঁর ওপর এরূপ কোন অবকাশের দিন আসেনি যখন তিনি কিনা আল্লাহ্‌র স্মরণের প্রতি অমুখাপেক্ষী ও অমনোযোগী হয়েছিলেন। বস্তুতঃ প্রয়োজন পড়ার আগেই প্রয়োজনগুলোর জন্যে তিনি দোয়া করে থাকতেন। আর সুন্নতটি তাঁর এতোই সুমহান যে, উম্মতে মুহাম্মদীয়ার জন্যে কিয়ামতকাল অবধি সম্ভাব্য যা কিছু প্রয়োজন আসন্ন ছিল, কল্পনার চোখে সেগুলোর বিবেচনা করেই রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তজ্জন্য দোয়া করে নেন।

কাজেই সে খোদা তাঁর দোয়াসমূহ কী করে অগ্রাহ্য করতে পারেন? যখন কিনা তিনি সেগুলোর কোনও প্রয়োজন পড়ার বা দেখা দেয়ার আগেই সেগুলোর জন্য দোয়া শুরু করে রাখেন। অতএব, যখনই প্রয়োজন দেখা দিবে তখনই এই মহান বান্দা তাঁর আল্লাহ্‌কে তাঁর নিকটে পাবেন, অর্থাৎ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকটে তো তিনি বিদ্যমানই থাকেন। কিন্তু আমরা তাঁকে নিকটে প্রত্যক্ষ করে থাকি। অর্থাৎ বড়ই অদ্ভূত বিস্ময়কর বিষয়বস্তু যে, চৌদ্দশ’ বছর পরও আঁ-হযরত (সাঃ)-এর দোয়া এমন ধারায় কবুল হচ্ছে যে, আমরা খোদাকে নিকটে দেখতে পারছি। কিন্তু নিকটে হয়ে থাকেন মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। আর ঐ নৈকট্যের দৃশ্যাবলীই আমরা অবলোকন করে থাকি। অতএব, সচ্ছলতা ও আরামের সময়ে আপনারাও এ পদ্ধতিটিই রপ্ত করুন। ঐ দোয়াগুলো করবেন যা দুটো দিকসম্পন্ন। একটি এই যে, সচ্ছলতা থাক, আরাম বিরাজ করুক এবং আল্লাহ্‌র কাছে কিছু চাওয়ার প্রয়োজন না থাক তবুও যেন আল্লাহ্‌র আবশ্যকতা থাকে। এই যে আল্���াহ্‌কে আমাদের প্রয়োজনের বিষয়টি তো এই আয়াতে করীমায় অন্তর্নিহিত রয়েছে, যা আমি পূর্বে বর্ণনা করে এসেছি - “যখন সে আমাকে ডাকে।” প্রয়োজন পূরণের সেখানে উল্ল্যেখ নেই-একথা বলেননি, ‘আমাকে প্রয়োজন পূরণের জন্যে ডাক’ বরং বলেছেন, “আমাকে অণ্বেষণ করতে থাকুক, আমাকে ডাকতে থাকুক-আমি যেন তাদের কাম্য হই।” যদি তা-ই হয় তাহলে এই সাধারণ দিনগুলোতে যখন কিনা খোদার কাছে চাওয়ার আবশ্যকতা থাকে না তখনও খোদার অন্বেষণ বিদ্যমান থাকা উচিত। অতএব, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এই সকল বিষয় বস্তুর দিকেই ইঙ্গিত করে বলেছেন, সচ্ছলতা ও আরামের সময়ে যখন তোমাদের খোদা প্রয়োজনের খাতিরে স্মরণে না আসেন, তখনও খোদার খাতিরে যেন খোদা তোমাদের স্মরণে আসেন। তখনও যদি খোদাকে তোমরা ডাকতে থাক, তাহলে তোমাদের প্রত্যেক বিপদে ও সংকটে তিনি তোমাদের সঙ্গে থাকবেন।

অতঃপর হযরত আবু মূসা (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীস যা ‘বুখারী, কিতাবুদ দায়ওয়াত বাব ফযলু যিকরিল্লাহ্’ থেকে গৃহীত।

আঁ-হযরত (সাঃ) বলেন, “যে তাঁর প্রতিপালক প্রভুকে স্মরণ করে তাঁর ‘যিক্‌র’ করে এবং যে করে না এতদোভয়ের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের ন্যায়।”

অতএব, তোমাদের উচিত যেন জীবিত হও এবং তোমাদের জীবন যেন যিকরে ইলাহীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এমনি তো দুনিয়াতে চল ফির, পানাহার কর। যে অস্থায়ী জীবনকাল এখানে নির্ধারিত আছে তা তোমরা পাবে-হয়ত তা সচ্ছলভাবে কেটে যাবে, না হয় দুঃখে-কষ্টে যেমন কিনা তোমাদের ভাগ্যে রয়েছে তারপর মরে যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহ্ হতে জীবন পায় সে (আসলে) আল্লাহ্‌র স্মরণ বা যিকরের দ্বারা জীবিত হয়, সে মরে না। এ বিষয়-বস্তুই প্রকৃতপক্ষে এ হাদীসটিতে বর্ণিত হয়েছে। নইলে, বলতে পার, যে-ব্যক্তি আল্লাহ্‌র যিক্‌র করল সে-ও মরে গেল আর যে করল না সে-ও মারা গেল। যে আল্লাহ্‌র যিক্‌র করেছে সে কখনও মরে না, কেননা, আল্লাহ্ কখনও মারা যান না। কাজেই আল্লাহ্‌র যিক্‌রের দরুন সে ব্যক্তি চিরস্থায়ী জীবন পেয়ে যায়, যা ইহকালীন জীবনের সাথেও সম্পর্কযুক্ত এবং পরকালীন জীবনের সাথেও। সহী মুসলিমে উক্ত বিষয়েরই আরেকটি হাদীস নিম্নরূপ:

রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যে গৃহে আল্লাহ্‌র যিকর করা হয় এবং যে গৃহে করা হয় না এতদোভয়ের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের ন্যায়। (মুসলিম কিতাবুস সালাত, বাব ইস্তেজাবু সালাতিল্ নাফেলাতে ফি বায়তিহি ওয়া জাওয়াযিহা ফিল মাসজিদে)

এ হাদীসটি আমাদেরকে এ বিষয়ে মনোযোগী ও সচেতন করে তোলে যে, একটি গৃহে বসবাস করে যদি কিছু পরিবার-সদস্য মৃতবৎ হয় যারা যিকরে ইলাহী করে না-তাঁকে স্মরণ করে না, তাহলে যারা যিকরে ইলাহী করে তাদের ফয়েয ও কল্যাণকর প্রভাব ঐ মৃতবৎদের উপর পৌঁছতে ও পড়তে পারে। এভাবে ঐ ঘরকে আল্লাহ্ জীবিত করে দিবেন। অতএব, অন্যেরাও যারা সেখানে থাকবে তারাও কিছু কল্যাণ ও ফয়েয পেতে পারে। কাজেই বিশেষতঃ ঐ সকল লোক যাদের সন্তানদের মাঝে, যাদের পরিজন ও আত্মীয়দের মধ্যে আল্লাহ্‌র যিক্‌র বিমুখ লোক রয়েছে, তারা এ হাদীসটি দৃষ্টিপটে রেখে নিজেদের গৃহের সঞ্জীবনের উদ্দেশ্যে অধিকমাত্রায় দোয়া করুন, যাতে আল্লাহ্‌র যিকরের দ্বারা সারা ঘর জীবিত হয়ে যায়। কেবল তাদের নিজেদের পর্যন্তই তা সীমিত না থাকে।

হযরত উমর (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীস প্রসঙ্গেই আমি সমগ্র জামাতের সমীপে দোয়ার জন্য অনুরোধ করে এসেছি। এদিনগুলোতে বিশেষরূপে দোয়া হওয়া উচিত এবং এই দোয়ার যে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে তা আঁ-হযরত (সাঃ)-এর এই সুন্নতের দ্বারা প্রমাণিত হয় যা হযরত উমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। হযরত উমর (রাঃ) রেওয়ায়াত করেন,

উমরার জন্যে আমি আঁ-হযরত (সাঃ)-এর কাছে অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি প্রদান করলেন আর সেই সাথে বললেন, “হে আমার ভাই! আমাদেরকে তোমার দোয়ায় ভুলে যেও না।”(তিরমিযী, কিতাবুদ দাওয়াত)

উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন সত্তা ছিলেন তিনি, যিনি সমস্ত জাহানের জন্য দোয়া করতে থাকেন আজীবন, পূর্ববর্তীদের জন্যও এবং পরবর্তীদের জন্যও এবং কিয়ামতকাল অবধি, যাঁর দোয়াসমূহ হচ্ছে আমাদের পুজিঁ, তাঁর বিনয়ের মোকাম ও মর্যাদা লক্ষ্য করুন, তাঁর অমায়িকতা দেখুন। হযরত উমরকে (রাঃ) বলেন, হে আমার ভাই! নিজের দোয়াতে আমাদের কথা ভুলে যেওনা। হযরত উমর (রাঃ) ঐ মহান ব্যক্তিটির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতেন। তাই যখন তাঁকে সম্বোধন করে রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তা বলেন তখন হযরত উমর (রাঃ) বলছেন,

‘হুযূরের সে কথায় আমি নিজেকে এতো আনন্দিত বোধ করি যে, এর বিনিময়ে যদি সারা দুনিয়া আমি পেয়ে যাই তবুও ততোটা আনন্দ বোধ করবো না।’ (তিরমিযী, কিতাবুদ দাওয়াত)

দোয়ার জন্যে বলাতে তিনি এজন্যই খুশী হয়েছেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) হযরত উমর (রাঃ)-কে নিজের জন্য দোয়ার ঐ যে সনদ প্রদান করলেন তা থেকে তিনি দোয়ার কবুলিয়তের সুসংবাদ পেয়ে যান। যদি হযরত উমরের দোয়া কবুল হবার বিষয়ে এবং যে খাঁটি নিয়্যত ও নিষ্ঠার সঙ্গে হযরত উমর (রাঃ) উমরা পালনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন সে সম্পর্কে আঁ-হযরত (সাঃ)-এর খেয়াল না হতো, তাহলে কখনও রসূলুল্লাহ (সাঃ) উমরের (রাঃ)-কে নিজের জন্যে দোয়ার কথা বলতেন না। হযরত উমরের (রাঃ) তত্ত্বজ্ঞানের দিকেও লক্ষ্য করুন রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) যেমন আল্লাহ্‌র তত্ত্ব-পরিচিতি সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন তেমনি আল্লাহ্‌র এই মহান বান্দা মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে কিছুটা হযরত উমরও (রাঃ) জানতেন। এ কারণেই তিনি খুশী হন। নইলে প্রত্যেকে বলবে, ‘দেখো! আমাকে দোয়ার জন্য বলেছেন, আমি তাতে অত্যন্ত খুশী হয়েছি।’ সে তার মধ্যে অহমিকার দরুনই খুশী হচ্ছে। পক্ষান্তরে হযরত উমরের মধ্যে কোন অহমিকা ছিল না-রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁকে দোয়ার জন্য বলাতে স্ফীত হয়ে তিনি খুশী হচ্ছিলেন না। বরং খুশী এজন্যে হচ্ছিলেন যেমন আগেই আমি বর্ণনা করেছি যে, তিনি (রাঃ) জানতেন যে, মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দোয়ার জন্য বলায় একটি সুসংবাদ নিহিত ছিল যে, তাঁর (রাঃ) দোয়া কবুল হবে, এর মোকাবেলায় যদি সমস্ত দুনিয়া পেতেন তাতে তিনি ভ্রুক্ষেপ করতেন না।

এখন, লাইলাতুল-কদরও হয়ত এদিনগুলোতেই আসবে। আল্লাহ্ ভাল জানেন কে এর সৌভাগ্য পাবে আর কে পাবে না। কিন্তু যারই এ সৌভাগ্য লাভ হয় অথবা অন্ততঃ যার এই ধারণা থাকে যে, এই লাইলাতুল কদর পাবার সৌভাগ্য তাঁর ঘটবে তাঁর পক্ষে আঁ-হযরত (সাঃ)-এর ঐ দোয়াটি কখনও বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়, যা কিনা লায়লাতুল-কদরের দোয়াসমূহের প্রাণস্বরূপ। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন,

“আমি আঁ-হযরত (সাঃ)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! আমি যদি জ্ঞাত হই যে, তা লাইলাতুল-কদর বটে, তাহলে সে মুহূর্তে আমি কি দোয়া চাইব? রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, তখন এই দোয়া করো; “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়্যূন, তুহিব্বুল আফ্ওয়া, ফা’ফু আন্নি”। (জামে তিরমিযী, কিতাবুদ দাওয়াত)

অর্থ: হে আমার আল্লাহ্! তুমি অত্যন্ত মার্জনাশীল, অত্যন্ত উপেক্ষাকারী, “তুহিব্বুল আফ্ওয়া” এবং উপেক্ষা করাই তুমি পসন্দ কর, “ফা’ফু আন্নি”-অতএব আমার ক্ষেত্রে উপেক্ষা কর (এবং ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে আমাকে দেখ)।

তরজমাকারীগণ তরজমা করেছেন, আমাদেরকে বখশে দাও, ক্ষমা কর। অথচ “আফুউয়্যূন”-এর অর্থ এখানে ক্ষমা করা বা বখশে দেয়া নয়। তা এর আগের স্তর। যদি তা পাওয়ার সৌভাগ্য ঘটে তা হলে অবলীলায় সে-ব্যক্তি ক্ষমাই পেয়ে গেল। ‘আফুউয়্যূন’ দ্বারা বুঝায় যে, আমাদের তথা সমস্ত মানুষের দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতিকে সদয় দৃষ্টিতে উপেক্ষাকারী এবং তাঁর (প্রিয়) বান্দাদের দুর্বলতাগুলোও তিনি উপেক্ষা ও মার্জনা করে থাকেন। যখন উপেক্ষা করা হয় তখন দুর্বলতা যেন আর থাকেই না-মার্জনা করে দেয়া হয়। অতএব ক্ষমার পূর্ববত�� স্তর হচ্ছে ‘আফ্উ”-এর স্তরটি। যদি ‘আফ্উ’-এর সৌভাগ্য লাভ হয় তাহলে ক্ষমা বা ‘বখশিশ’ যেন এমনিতেই লাভ হল ‘আফ্উ’-এর কল্যাণেই।

সুতরাং এখানে রসূলুল্লাহ (সাঃ) ‘ফাগ্‌ফির���ি’-এর দোয়া শিখাননি। তা এজন্যেই যে, ক্ষমা প্রদর্শন ব্যতিরেকেই ‘আফ্উ’ মূলতঃ পরিপূর্ণ এবং প্রথম ও প্রধান স্থানবিশিষ্ট, যদি আল্লাহ্‌ তাআলা আজীবন স্বীয় বান্দাদের সাথে ‘আফ্উ’ সুলভ ব্যবহার করেন এবং তার পাপসমূহ উপেক্ষা করতে থাকেন তাহলে এর ফলাফল কী হতে পারে? দুটি ফল হতে পারে। একটি ভাল আর একটি মন্দ। ভাল ফলটি তো এই যে, ‘আফ্উ’-এর ফলশ্রুতিতে মানুষের অন্তরে তাঁর সম্বন্ধে মাহাত্ম্যবোধ এবং তাঁর প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং প্রতিনিয়ত সে চেষ্টা করে যেন এমন মওকা না আসে যখন তিনি আমার গুনাহ্‌র কারণে আমার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে আরম্ভ করেন-মন্দ চোখে আমাকে দেখেন। এ সেই ফল, যার দিকে রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আমাদের মনোযোগী করেছেন এবং লাইলাতুল-কদরের দোয়ার ক্ষেত্রে এরচে’ উত্তম ও অধিকতর দোয়া আর কী হতে পারে? অপর ফলটি হতে পারে পাপের আস্পর্ধা। আপনারা বাড়ীতে শিশু সন্তানদেরকে তাদের ভুল-ভ্রান্তির জন্য কখনও যদি শাসন না করেন, সবসময় যদি উপেক্ষা করতে থাকেন তাহলে মন্দ কাজে তাদের আস্পর্ধা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কাজেই আঁ-হযরত (সাঃ) লাইলাতুল কদরের সময় গুনাহ্‌র আস্পর্ধার দোয়া তো অবশ্যই শিখাচ্ছিলেন না। সেজন্যই, এ দোয়াটিতে সে অর্থই নিহিত যা আমি বর্ণনা করেছি। এ দিক দিয়ে ‘আফ্উ’ গুফ্রানের উর্ধ্বতন স্থান বটে। অর্থাৎ যখনই খোদা ‘আফ্উ’ সুলভ ব্যবহার করেন তখন সহসা আপনাদের মনোযোগ সে দিকে নিবদ্ধ হোক। অনেক সময় মানুষ ঠাহর করতে সক্ষম হয়, এবং ভুল করার সময় মানুষ বলে যে, আমি ভুল করছি। তখন সহসা খেয়াল হয় যে, আরে! একজন যে খোদা আছেন তিনি আমাকে প্রত্যক্ষ করেছেন আর তখন অন্তর থেকে দোয়া নির্গত হয়, তিনি যেন উপেক্ষা করেন। এরপর যখনই ভুল সংঘটিত হতে যাবে, এই খেয়াল তখন অন্তরে নিশ্চয় জেগে উঠবে।

তারপর, এ খেয়ালও তো জাগ্রত হওয়া উচিত যে, আল্লাহ্‌র কল্যাণ দৃষ্টি থেকে আমি কেন-ই বা এক মুহূর্তও পৃথক বা বঞ্চিত থাকি। শুধু কি এজন্য যে, আমি দুর্বল এবং গুনাহ্‌তে বার বার লিপ্ত হয়ে পড়ি? এটা এই দোয়ার এক স্বভাবিক ফল-একটি যৌক্তিক পরিণতি, যার ফলশ্রুতিতে মানুষ এই চায় আল্লাহ্ যেন আমাদের ওপর থেকে তাঁর সদয় দৃষ্টি আর কখনও না সরান, অর্থাৎ গুনাহ্‌র দরুন তাঁর দৃষ্টি না ফিরান তা নয় বরং গুনাহ্ করার ক্ষমতা অর্থাৎ গুনাহ্ করার সাহসই যেন আমাদের রহিত হয়ে যায়। তারপর আমরা যেন খোদার সদয় দৃষ্টি আমাদের ওপরে এরূপে পড়তে অবলোকন করি যে, তিনি যেন সম্পূর্ণ সুদৃষ্টিতে আমাদের দেখেন এটা ‘আফ্উ’ বিরোধী নয়। সুতরাং হযরত মসীহ্ মাওউদ (আঃ) এই দোয়া করেন যে,

প্রত্যেক অবস্থায় সর্বক্ষণ আল্লাহ্ আমায় দেখছেন, আল্লাহ্ আমায় দেখছেন-“সুবহানা মাইঁ ইয়ারানী”-‘পবিত্র তিনি, যিনি সদা আমায় দেখেন।

এর অর্থ এই যে, আমি তো আল্লাহ্‌র খাতিরে নিজের অন্তঃকরণকে মেজে-ঘষে এরূপ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেছি এবং আল্লাহ্ ও আমার সাথে এরূপ ব্যবহার করেন যে, যদি কোন ত্রুটি অবশিষ্ট থেকেও যায় তাহলে তিনি (মার্জনা সুন্দর দৃষ্টিতে) তা উপেক্ষা করেন। এমনকি, এখন আমি এই আকাঙ্ক্ষা রাখি যে, প্রত্যেক অবস্থায়, সব দিক দিয়ে আমার অভ্যন্তরের সর্বত্র খোদাতাআলা যেন সদয় দৃষ্টিপাত করেন এবং সর্বদা আমাকে হিফাযত করতে থাকেন।

অতএব হাদীস বর্ণিত এ সেই দোয়া, যা (এই রাতগুলোতে) চাওয়ার সময় উল্লেখিত বিষয়-বস্তুটি অবশ্যই দৃষ্টিপটে রাখুন। অন্যথায়, যদি এই দোয়া চাওয়া হয় যে, হে খোদা! আমরা গুনাহ্ করতে থাকি আর তুমি তা উপেক্ষা করতে থাকো; তাহলে তা গুনাহ্‌র আস্পর্ধা উদ্রেকের কারণ হবে, গুনাহ্‌র প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করবে না। অতএব, এখন উক্ত বিষয়বস্তুটি দৃষ্টিপটে রেখে আমি দোয়াটির পুনরাবৃত্তি করছি। আরবি শব্দ যদি মনে না থাকে তাহলে এর অর্থ বিষয়বস্তু স্মরণ রেখে দোয়াটি করতে থাকুন।

“হে আমার আল্লাহ্! তুমি ‘আফ্উ’-কারী “ইন্নাকা আফুউয়্যূন।” এর আসল অর্থ, পরিপুর্ণ ‘আফ্উ’। ‘তুহিব্বুল আফ্-ওয়া’-‘আফ্উ’-কে ভালবাস, পসন্দ কর। “ফা’ফু আন্নি” অতএব তুমি আমার প্রতিও ‘আফ্উ’ কর (অর্থাৎ সদয় দৃষ্টি নিক্ষেপে আমার দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা কর এবং সেগুলো সম্পূর্ণ দূর করে আমার প্রতি সর্বদা তোমার পরিপুর্ণ প্রসন্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ কর। সদা আমাকে হিফাযত কর। উক্ত সব বিষয়-ই ‘আফ্উ’-এর অর্থের অন্তর্ভুক্ত-অনুবাদক)

এই দোয়াটি যে অর্থে আমি বর্ণনা করেছি যদি আপনারা তা সেভাবে করেন তাহলে এই দোয়াতে আমাদেরকেও স্মরণ রাখবেন। সমগ্র জামাতকে তাতে শামিল রাখুন এবং সমগ্র বিশ্বকে নিজেদের দোয়ার অন্তর্ভুক্ত করুন। কেননা আমরা চাই এই রমযানের ফয়েয দ্বারা আহ্‌মদীয়া জামাত যেন সমস্ত দুনিয়াকে কল্যাণমন্ডিত করে তুলতে সক্ষম হয়।

রমযানের শেষ দশকের শেষ দিকে একটি শুক্রবার আসবে যাকে মানুষে ‘জুমুআতুল বিদা’ বলে থাকে এবং এর সম্পর্কে আমি সবসময় বলে থাকি যে, এই শুক্রবারটিকে (প্রকৃতপক্ষে) ‘জুমুআতুল ইস্তেকবাল’ বলা উচিত, বিদা (বিদায়) নয়, বরং ইস্তেকবাল (সংবর্ধনাজ্ঞাপনমূলক জুমুআ) অধিকতর আগ্রহ ও আয়োজনে এর সংবর্ধনা করুন। কেননা, ওরূপ জুমুআ (এ বছর) পুনরায় আপনাদের ভাগ্যে জুটবে না। অতএব, এর ইস্তেকবাল বা সম্বর্ধনা এভাবে করুন যাতে এটা আপনাদের কাছেই অবস্থান করে অর্থাৎ এর বরকত ও আশিসসমূহ যেন আপনাদেরই হয়ে যায়। অনেক সময় আপনারা বড় লোকদের সম্বর্ধনা দিয়ে থাকেন। তারা আসেন এবং তারপরেই চলে যান। ওটা ইস্তেকবালও এবং বিদায়ও। কিন্তু যদি এরূপ প্রিয়জনকে অভ্যর্থনা করেন যাকে নিজের ঘরেই বসিয়ে নেন, সাদরে রেখে দেন, তাকে স্বীয় অন্তর থেকে আর কখনও পৃথক হয়ে সরে যেতে না দেন তাহলে এই সম্বর্ধনাটি হচ্ছে আরেক ধরনের মর্যাদাপূর্ণ সম্বর্ধনা। অতএব, রমযানের শেষ দশকের আগামী জুমুআকে আমি এই অর্থে (বিদায়ের পরিবর্তে ) সম্বর্ধনামূলক জুমুআ বলে অভিহিত করছি। তাই এর সম্বর্ধনা করুন এরূপে যে, আল্লাহ্‌ তাআলা যেন আপনাদের ভালবাসা এবং ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে আপনাদের কাছেই অবস্থান গ্রহণ করেন এবং রমযানের এই যাবতীয় বরকত ও আশিস যেন সারা বছর ব্যাপী আপনাদেরই হয়ে যায়।

এই ভূমিকার সাথে আমি হযরত মসীহ্ মাওউদ (আঃ)-এর উদ্ধৃতি সমূহ উপস্থাপন শুরু করছি। একটি উদ্ধৃতির সামান্য অংশ বর্ণনা করতে পারবো। বাকী ইনশাআল্লাহ্‌ আগামী জুমুআর খুতবায়। “যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।” এটা সেই আয়াতেরই তফসীর, যার কিছু ব্যাখ্যা আমি পূর্বে করে এসেছি।

“যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে যে, খোদার অস্তিত্বের উপর দলীল কী? তখন এর জবাব এই যে, আমি অতি নিকটে বিদ্যমান অর্থাৎ বড় কোন দলীল-প্রমাণের প্রয়োজন নেই, আমার অস্তিত্ব অতি নিকটতম পথে (বা পন্থায়) বোধগম্য হতে পারে এবং অত্যন্ত সহজ উপায়ে আমার অস্তিত্বের উপর দলীল নির্ণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। আর সে দলীল এই যে, যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে তখন আমি তার প্রার্থনা শ্রবণ করি এবং স্বীয় ইলহাম (ঐশীবাণী) দ্বারা তাকে সাফল্যমন্ডিত হবার সুসংবাদ দান করি।”

এ অর্থটি হচ্ছে, আমি যা উপস্থাপন করেছিলাম তদ্ব্যতীত অপর একটি অর্থ। অর্থাৎ যদি তোমরা আল্লাহ্‌ তাআলার অস্তিত্বের প্রমাণ চাও তাহলে তোমরা নিজেরা এরূপ হয়ে যাও যে, আল্লাহ্ তোমাদের প্রার্থনায় সাড়া দিতে আরম্ভ করেন। যখন সাড়া দিতে আরম্ভ করবেন তখন তোমরা আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের দলিলস্বরূপ হবে। যদি তিনি তোমাদের দোয়া না শোনেন অর্থাৎ তোমরা তাঁর থেকে দূরে থাক তাহলে তোমরা আল্লাহ্‌ তাআলার অস্তিত্বের পক্ষে কোন দলিল হিসেবে উপস্থাপিত হতে পার না।

“যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে তখন আমি তার কথা শুনি এবং স্বীয় ইলহাম দ্বারা তার ��ফলতার বিষয়ে সুসংবাদ দেই।”

এখন, স্পষ্ট যে, যে-ব্যক্তি আল্লাহ্‌র নিকটবর্তী হবে এই রমযানের এই দশকে, আল্লাহ্ তাকে স্বীয় নৈকট্যের দ্বারা ভূষিত করবেন, তাকে বহু রকম সুসংবাদ রুইয়া সালেহা (সত্যস্বপ্ন), কাশ্‌ফ (দিব্যদর্শন) ও ইলহামসমূহের মাধ্যমে দান করবেন।

“যদ্বারা আমার (আল্লাহ্‌র) অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাসই নয়, বরং সর্বশক্তিমান হওয়াও সন্দেহাতীত বিশ্বাসের পর্যায়ে পৌঁছায়।”

অর্থাৎ কেবল মাত্র এ উপায়েই তোমাদের বোধগম্য হবে যে, খোদা বিদ্যমান আছেন। বরং যখন তিনি তোমাদের দোয়াসমূহ শ্রবণ করবেন তখন সর্বশক্তিমান হবারও প্রমাণ দিবেন। অর্থাৎ তোমরা তাঁর নিকট যা প্রার্থনা কর তা তোমাদের দানও করেন। অতএব, কুদরত (ক্ষমতা) ব্যতিরেকে কী করে দান করতে পারেন! অতএব, এরূপে দোয়া কর যাতে তা শ্রবণ ও গ্রহণ করেন এবং তাতে তাঁর কুদরতের নিদর্শনও প্রকাশিত হয়।

“কিন্তু মানুষের উচিত যেন নিজেদের মধ্যে তাকওয়া এবং খোদাভীরুতার এরূপ অবস্থার সৃষ্টি করে যাতে তাদের দোয়া আমি শ্রবণ করি। আর উচিত, তারা যেন আমাতে ঈমান আনয়ন করে এবং তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয়। তার আগে তারা স্বীকার করুক যে, খোদা বিদ্যমান আছেন এবং তিনি সবরকম শক্তি ও ক্ষমতা রাখেন। কেননা, যে-ব্যক্তি ঈমান আনে তাকে অভিজ্ঞতামূলক তত্ত্বজ্ঞান দান করা হয়।”

অতএব, যেহেতু এ উদ্ধৃতিটি ছাড়া অন্যান্য উদ্ধৃতির জন্য এখন আর সময় নেই, সেজন্য ইনশাআল্লাহ্‌ আগামী খুতবায় নতুন কোন বিষয় বস্তু শুরু করার পরিবর্তে এ বিষয়টি-ই অব্যাহত থাকবে এবং পরবর্তী উদ্ধৃতিসমূহ উপস্থাপিত হবে।

অনুবাদঃ মাওলানা আহমদ সাদেক মাহমুদ, মুরব্বী সিলসিলাহ্

প্রাপ্ত সুত্র: পাক্ষিক আহ্‌মদী - ১৫ই অক্টোবর, ২০০৬ইং