ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করা - জুমুআর খুতবা । Seek Allah's Help with Patience and Prayers - Friday Sermon

ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করা

রোজ শুক্রবার, ১২ই মে, ২০১৭ইং

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نُوْدِىَ لِلصَّلٰوةِ مِنْ يَّوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا اِلٰى ذِكْرِ اللّٰهِ وَذَرُوْا الْبَيْعَ‌ؕ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّـكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ‏

হে যাহারা ইমান আনিয়াছ ! যখন তোমাদিগকে জুমুআর দিনে নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন আল্লাহ্‌র স্মরণের জন্য দ্রুত আস এবং ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ কর। ইহা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

(আল্‌ জুমুআ: ১০)

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বর্তমান ইমাম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ১২ই মে, ২০১৭ইং রোজ শুক্রবার লন্ডনের বায়তুল ফুতুহ্‌ মসজিদ থেকে “ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করা”- সম্পর্কে জুমুআর খুতবা প্রদান করেন।

তাশাহুদ, তাঊয, তাসমিয়া এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৪নং আয়াত তেলাওয়াত করেন, যার বঙ্গানুবাদ হল- ‘‘হে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”

হুযুর (আই.) বলেন, মানুষের জীবনে বিভিন্ন বিপদ বা সমস্যাবলী এসে থাকে যাতে ধৈর্য ধরা ছাড়া কোন উপায় থাকে না; ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ইত্যাদির ক্ষতি হয়। দুনিয়াদার লোকেরা এমন পরিস্থিতিতে শোকভোগ-কান্নাকাটি ইত্যাদি করে পরে তা সহ্য করে নেয়, তবে তাদের এরূপ করার পূর্বে তারা আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ-অনুযোগ ও অন্যায় কথা বলে বসে। কেউ কেউ পার্থিব ক্ষতি সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে বসে। কিন্তু আল্লাহ্‌র এমন কিছু বান্দাও হন যারা আল্লাহ্‌র প্রেরিত কোন ব্যক্তিকে মানার কারণে প্রাণ বা ধন-সম্পদের ক্ষতি, মানসিক বা শারীরিক কষ্টের শিকার হন, কিন্তু তারা কোন অভিযোগ-অনুযোগ ছাড়াই তা সহ্য করে। হ্যাঁ, তারা আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া অবশ্যই করেন যে যেহেতু আল্লাহ্‌র প্রেরিত ব্যক্তিকে মানার ফলে তারা এই কষ্টের শিকার হচ্ছেন তাই আল্লাহ্ যেন তাদের ধৈর্যশক্তি বাড়িয়ে দেন এবং অত্যাচারীদের অত্যাচার থেকে তাদের রক্ষা করেন। মুসলমানরা তো বিভিন্ন নবী-রসূলদের জামাতের এবং প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের এরকম অত্যাচার সহ্য করার কাহিনী শুনে থাকে, কিন্তু আহমদীরা এ যুগের মসীহ্ ও মাহদীকে মানার কারণে নিজেরাই সেই দৃশ্য প্রদর্শন করে বা করে আসছে যা অন্য মুসলমানদের জন্য গল্প-কাহিনী। অন্য মুসলমানদের সাথে আহমদীদের এটি এক বিশাল পার্থক্য যে আহমদীরা কখনোই অন্যদের উপর অত্যাচার করে না, এর বিপরীতে অন্য মুসলমানরা সুযোগ পেলেই পরস্পরের উপর বা আহমদীদের উপর চড়াও হয়। আর আহমদীরা এটিও খুব ভালভাবে জানে যে আমাদের বিপদ ও দুঃখের অবসান একমাত্র আল্লাহ্ই করতে পারেন; তাই জগতের কারো কাছে বা কোন শক্তির কাছে নয়, বরং আল্লাহ্‌র কাছেই আমাদের সমর্পিত হতে হবে। আর যেভাবে রসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, মুমিনের প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুঃখ-কষ্টও যা সে আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করে সহ্য করে তার প্রতিদানে সে কল্যাণ ও পুণ্যে সিক্ত হয়; সে অনুসারে আমাদের সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করতে হবে ও আল্লাহ্‌র প্রতি বিনত হতে হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ্‌র ভালবাসা পেতে হলে ধৈর্য ও বিনয় অবলম্বন করতে হয়। আর যারা এভাবে আল্লাহ্‌র ভালবাসা ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দায় পরিণত হয় তাদের জন্য আল্লাহ্ এক ধরনের আত্মাভিমান রাখেন, যারা তাদের উপর অত্যাচার করে তাদেরকেও আল্লাহ্ পাকড়াও করেন। তিনি (সা.) বলেন, অত্যাচারিত হয়ে ধৈর্য ধরলে আল্লাহ্ সেই ব্যক্তিকে সম্মানিত করেন; আর আল্লাহ্ কর্তৃক সম্মানিত হওয়ার চেয়ে বড় কিছু তো আর হতে পারে না। হুযুর (আই.) বলেন, অতএব পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আহমদীদের উপর যে অত্যাচার হচ্ছে তার জবাবে আমাদের ধৈর্য ধারন করা ও আল্লাহ্‌র দরবারে বিনত হয়ে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করাই আসল কর্তব্য।

হুযুর (আই.) রসূলুল্লাহ্ (সা.) ও তাঁর সাহাবাগণের কথা উল্লেখ করে বলেন যে তাঁরা কষ্টের মধ্যে থেকেও ধৈর্য ধরতেন এবং তবলীগের কাজ অব্যাহত রাখতেন। তাই আমাদেরকেও এই আদর্শই অনুসরণ করতে হবে। এর ফলে অমুসলিম ও অ-আহমদী উভয়েই আমাদের শত্রুতায় লিপ্ত হবে। অমুসলিমরা বাহ্যত ভদ্র আচরণ করলেও যখন দেখবে যে তাদের মধ্য থেকে লোকজন দলে-দলে আহমদীয়াত গ্রহণ করছে তখন তারাও চরম অন্যায় ও অত্যাচার আমাদের উপর করবে। আর অ-আহমদী মোল্লারা সাধারণ মুসলমানদের উপর তাদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে বা রাজনীতিবিদরা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য আমাদের উপর চড়াও হবে এবং হচ্ছেও। কিন্তু এতে ভীত হয়ে আমাদের তবলীগের কাজে ছাড় দেয়া যাবে না। হুযুর (আই.) পাকিস্তানের আযাদ কাশ্মীরের সাম্প্রতিক বিরোধিতা বা পাকিস্তান, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি স্থানে চলমান বিরোধিতার উল্লেখ করেন। এরপর হুযুর (আই.) সম্প্রতি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার সোহাগী জামাতে উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসী মোল্লাদের আক্রমণের কথা উল্লেখ করেন যারা মুরব্বী মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে যখম করে। হুযুর (আই.) বলেন, তাকে এত মারাত্মকভাবে যখম করেছে যে তার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছে, পেটের ক্ষত দিয়ে কিডনী বেরিয়ে এসেছে, ঘাড়ের কোপে সামান্যর জন্য জীবনশিরা রক্ষা পেয়েছে, সারা শরীর থেকে প্রবল বেগে রক্ত বেরিয়েছে। পরবর্তীতে জামাতের সদস্যরা সেখানে পৌঁছে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং তাকে রক্তও দিয়েছে। পরবর্তীতে দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যে চিকিৎসা হয়েছে তার ফলে বর্তমানে অবস্থা মোটামুটি ঠিক হলেও এখনও সে আশঙ্কামুক্ত নয়। চেতনা আসার পর যদিও তার জন্য কথা বলা সম্ভবপর ছিল না, কিন্তু কাগজে লিখে লিখে তিনি তার মনের ভাব প্রকাশ করেছেন। মুমিনের যে উন্নত মর্যাদা সে অনুসারে তিনি নিজেকে নিয়ে চিন্তিত না হয়ে তার স্থানে অবস্থানরত মুরব্বীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়েছে কিনা সেই খোঁজ নিয়েছেন, বাবা-মার খোঁজ নিয়েছেন। হুযুর (আই.) বলেন, আল্লাহ্ তাকে দ্রুত আরোগ্য ও সুস্থ-সবল-দীর্ঘ জীবন দান করুন। হুযুর (আই.) বলেন, আহমদীয়াত গ্রহণ করলে যে এরকম বিপদ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে তা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আমাদের আগেই জানিয়েছেন, আর এ-ও বলেছেন যে এসব পরীক্ষার মাধ্যমে আসলে মানুষের ঈমান দৃঢ় হয়। অতএব আমাদের দায়িত্ব ধৈর্য ধরা ও দোয়া করা এবং আল্লাহ্‌র সাহায্য প্রার্থনা করা, এবং এভাবে নিজেদের কর্মকান্ড দিয়ে এটি প্রমাণ করে দেয়া যে আহমদীয়াত গ্রহণ করেই আমরা সঠিক কাজ করেছি।

হুযুর (আই.) এরপর আরেকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি কেউ একজন হুযুরের কাছে অভিযোগ করেছেন যে কোন এক আহমদী সোশ্যাল মিডিয়াতে কোন অ-আহমদীর সাথে তর্কের এক পর্যায়ে অশোভন ভাষা প্রয়োগ করেছে। হুযুর (আই.) বলেন, একথার সত্যতা কতটুকু তা যদিও জানা যায় নি, কিন্তু যদি তা সত্য হয়ে থাকে তবে তা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। এমন লোকদের বরং তবলীগ করাই উচিত নয়। হুযুর (আই.) বলেন, কটু বাক্য তো তারা ব্যবহার করে যাদের কাছে যুক্তি-প্রমাণ নেই। আমরা তো সর্বদিক থেকে যুক্তি-প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই যদি কেউ আমাদের গালিও দেয় তবুও তার প্রত্যুত্তরে আমাদের নম্র ও শালীন ভাষা ব্যবহার করতে হবে এবং যুক্তির মাধ্যমে তাদেরকে পরাস্ত করতে হবে। হুযুর (আই.) এ প্রসঙ্গে হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর বিভিন্ন নসীহত তুলে ধরেন। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, আমাদের বিজয় লাভের উপকরণ হল ইস্তেগফার, তওবা, ধর্মীয় জ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন, খোদা তা’লার মাহাত্ম্যকে দৃষ্টিতে রাখা, পাঁচ বেলার নামায নিয়মিত আদায় করা ও এতে দোয়া করা, একাজে কোন আলস্য না দেখানো, পাপ ও নোংরামি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা, খোদার নির্দেশাবলী মানার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকা এবং খোদার পথে কষ্ট ও ত্যাগ-স্বীকারকে ধৈর্যের সাথে সহ্য করা। হুযুর দোয়া করেন যে আল্লাহ্ তা’লা আমাদেরকে ধৈর্যের সাথে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার ও সন্তুষ্টি অর্জনের এবং তাঁর কৃপারাজি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমীন।

খুতবার শেষের দিকে হুযুর (আই.) একটি গায়েবানা জানাযার উল্লেখ করেন। এটি কেরালানিবাসী মোকাররম নাজিম উদ্দীন সাহেবের যিনি গত ৩ মে একটি কুরআন প্রদর্শনী থেকে ফেরার পথে ট্রেন-দুর্ঘটনায় নিহত হন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হুযুর (আই.) মরহুমের সংক্ষিপ্ত যিকরে খায়ের করেন এবং তাঁর পদমর্যাদার উন্নতির জন্য দোয়া করেন।

Top