শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ - নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীগণ: হযরত উসমান বিন আফ্‌ফান (রা.)

রোজ শুক্রবার, ৯ই এপ্রিল, ২০২১ইং

জুমুআর খুতবার সারমর্ম

এই জুমু’আর খুতবার সারাংশটিতে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তার দায়ভার আহ্‌মদীয়া বাংলা টীম গ্রহণ করছে।

আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব-প্রধান ও পঞ্চম খলীফাতুল মসীহ্‌ হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) গত ৯ই এপ্রিল, ২০২১ইং ইসলামাবাদের মসজিদে মুবারকে প্রদত্ত জুমুআর খুতবায় পূর্বের ধারা অনুসরণে নিষ্ঠাবান বদরী সাহাবীদের বর্ণাঢ্য জীবনের স্মৃতিচারণ করেন। এ খুতবায় হযরত উসমান (রা.)’র স্মৃতিচারণের ধারা শেষ করেন।

তাশাহহুদ, তাআ’ব্বুয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পরও সাহাবীরা হযরত উসমান (রা.)-কে কোন দৃষ্টিতে দেখতেন, সে সংক্রান্ত কিছু বিবরণ হুযূর (আই.) তুলে ধরেন। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন উমর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.)-এর যুগে আমরা সাহাবীদের কতককে অপর কতকের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আখ্যা দিতাম এবং মনে করতাম হযরত আবু বকর (রা.) হলেন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, এরপর হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা.) ও এরপর হযরত উসমান বিন আফফান (রা.)। বুখারী শরীফের অনুরূপ এক হাদীস থেকে জানা যায়, এই তিনজনের পর অবশিষ্ট সাহাবীদের মধ্যে তারা আর কোন শ্রেষ্ঠত্বের অনুক্রম করতেন না, তাদের সবাইকে সমান জ্ঞান করতেন। মহানবী (সা.)-এর তিরোধানের পরও যে হযরত উসমান (রা.)-কে সাহাবীরা বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের দৃষ্টিতে দেখতেন, সে সংক্রান্ত একটি বিবরণও হুযূর তুলে ধরেন। মুহাম্মদ বিন হানফিয়া বর্ণনা করেন, “আমি আমার পিতা হযরত আলীকে জিজ্ঞেস করি, ‘মহানবী (সা.)-এর পর শ্রেষ্ঠ মানুষ কে?’ তিনি বলেন, ‘আবু বকর (রা.)।’ আমি জানতে চাই, ‘এরপর কে?’ তিনি উত্তর দেন, ‘এরপর উমর (রা.)।’ আমি ভয়ে ভয়ে আবার জিজ্ঞেস করি, ‘এরপর কে?’ তিনি উত্তর দেন, ‘হযরত উসমান (রা.)।’ তখন আমি জিজ্ঞেস করি, ‘হে পিতা, এরপর কি আপনি?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘আমি তো মুসলমানদের মধ্যে একজন সাধারণ মানুষ মাত্র’!”

হযরত উসমান (রা.)’র সাথে মহানবী (সা.)-এর বিশেষ সম্পর্ক এবং তাঁর (সা.) দৃষ্টিতে হযরত উসমান (রা.)’র যে বিশেষ মর্যাদা ছিল- সে সংক্রান্ত একটি ঘটনাও হুযূর (আই.) উল্লেখ করেন। হযরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, একবার এমন এক ব্যক্তির জানাযা মহানবী (সা.)-এর সামনে নিয়ে আসা হয়, যে হযরত উসমান (রা.)’র প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতো; কিন্তু মহানবী (সা.) তার জানাযা পড়ান নি। কেউ একজন নিবেদন করেন, ‘হে আল্লাহ্র রসূল (সা.)! আমরা ইতোপূর্বে কখনও দেখিনি যে, আপনি কারও জানাযার নামায পড়ান নি!’ তখন মহানবী (সা.) বলেন, ‘এই ব্যক্তি উসমানের প্রতি বিদ্বেষ রাখতো, তাই আল্লাহ্ তা’লাও তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করেন।’

হযরত উসমান (রা.)’র ন্যায়পরায়ণতা সংক্রান্ত একটি ঘটনাও হুযূর বুখারী শরীফ থেকে উল্লেখ করেন যা থেকে বুঝা যায়, তিনি অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ায় নিজের ভাইকেও কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। উবায়দুল্লাহ্ বিন আদী বর্ণনা করেন যে হযরত মিসওয়ার বিন মাখরামা ও আব্দুর রহমান বিন আসওয়াদ তাকে হযরত উসমান (রা.)’র কাছে গিয়ে তার ভাই ওয়ালীদের বিষয়ে মানুষজন যেসব কানাঘুষা করছে- সেটি অবগত করতে বলেন। উবায়দুল্লাহ্ যখন তার কাছে যান, তখন হযরত উসমান (রা.) নামাযের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। উবায়দুল্লাহ্ বলেন, ‘আপনার সাথে আমার একটি কথা আছে আর সেটি আপনার প্রতি শুভাকাঙক্ষার কারণেই।’ হযরত উসমান (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি মা’মারের পক্ষ থেকে কিছু বলতে এসেছ? আমি তোমার কাছ থেকে আল্লাহ্‌র আশ্রয় চাই!’ একথা শুনে উবায়দুল্লাহ্ ফিরে যান। হযরত উসমান (রা.) তাকে পুনরায় দূত মারফৎ ডেকে পাঠান ও তার বক্তব্য জানতে চান। উবায়দুল্লাহ্ তখন তাকে তার ভাই ওয়ালীদ সম্পর্কে মানুষজনের কানাঘুষার বিষয়ে বলেন; ওয়ালীদ সম্পর্কে জানা গিয়েছিল যে তিনি মদ্যপান করেছেন। হযরত উসমান (রা.) বলেন, ‘তাকে তো আমি তার উপযুক্ত শাস্তি অবশ্যই দিব, ইনশাআল্লাহ্!’ এরপর তিনি হযরত আলী (রা.)-কে ডাকেন ও ওয়ালীদকে চাবুক মারতে বলেন। তার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর হযরত উসমান (রা.) আত্মীয়তার খাতিরে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেন নি, বরং অন্যদের তুলনায় তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দিয়েছেন, যেমনটি হযরত উমর (রা.)ও করেছিলেন। সাধারণের বেলায় যেখানে চল্লিশবার চাবুক মারা হতো, সেখানে ওয়ালীদকে আশিবার চাবুক মারা হয়।

হযরত উসমান (রা.)’র মুক্ত ক্রীতদাস হুমরান বর্ণনা করেন, একবার তিনি হযরত উসমান (রা.)-কে ওযু করতে দেখেন; তিনি পাত্র থেকে পানি ঢেলে উভয় হাত তিনবার করে ধৌত করেন, তারপর ডানহাত দিয়ে পাত্র থেকে পানি নিয়ে তিনবার কুলি করেন, নাক পরিষ্কার করেন, তারপর মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত উভয় হাত ধৌত করেন ও মাথা মাসাহ্ করেন, এরপর দু’পা গোড়ালি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করেন এবং বলেন, মহানবী (সা.) বলতেন, ‘যে আমার এই ওযু করার মত ওযু করে এবং এরপর এভাবে দু’রাকাত নামায পড়ে যে, তাতে নিজের প্রবৃত্তির কোন বিষয় রাখে না, তবে তার পূর্বকৃত যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ সামান্য ভিন্নতার সাথে অনুরূপ আরও একটি বর্ণনাও হুযূর উল্লেখ করেন; সেই বর্ণনায় এই উল্লেখও রয়েছে যে, মহানবী (সা.) ওযু করার পর হেসে বলেছিলেন, মানুষ যখন ওযু করতে গিয়ে তার একেকটি অঙ্গ ধৌত করে, তখন আল্লাহ্ তা’লা সেই অঙ্গ দিয়ে করা তার সকল পাপ ক্ষমা করে দেন।

জুমুআর দিন যে দ্বিতীয় আযান দেয়া হয়- সেটির প্রচলনও হযরত উসমানের খিলাফতকাল থেকেই প্রচলিত হয়। মহানবী (সা.), হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা.)’র যুগে ইমাম যখন মসজিদে এসে মিম্বরে বসতেন, তখনই একমাত্র আযান দেয়া হতো। হযরত উসমান (রা.)-এর খিলাফতকালে যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তখন মদীনার বাজারে ‘যু’রা’ নামক স্থানে তৃতীয় আরেকটি আযান দেয়ার প্রচলন করা হয় বলে বুখারী শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। হুযূর (আই.) এর ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করেন, অর্থাৎ তিনটি আযান বলতে প্রথম আযান, দ্বিতীয় আযান ও ইকামতকে বোঝানো হয়েছে; যেহেতু ইকামতও নামায আরম্ভ হওয়ার ঘোষণা, তাই বুখারী শরীফে সেটিকেও আযান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফিকাহ্ আহমদীয়াতেও হযরত উসমান (রা.)’র খিলাফতকালে জুমুআর অতিরিক্ত আযানের প্রচলন হওয়ার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঈদের দিন জুমুআর নামাযের ব্যাপারে ছাড় সংক্রান্ত একটি বর্ণনাও হুযূর উল্লেখ করেন। আবু উবায়দ বর্ণনা করেন, একবার তিনি হযরত উমর (রা.)’র যুগে তার পেছনে ঈদুল আযহার নামায পড়েন; নামায শেষে খুতবায় হযরত উমর (রা.) দুই ঈদের দিনে রোযা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে বলেন। আবু উবায়দ পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)’র খিলাফতকালে তার পেছনেও ঈদের নামায পড়েন, সেই দিনটি জুমুআর দিন ছিল। নামায শেষে খুতবায় হযরত উসমান (রা.) বলেন, ‘হে লোকসকল, আজকের দিনে তোমাদের জন্য দু’টি ঈদ একত্রিত করে দেয়া হয়েছে। মদীনার আশপাশ থেকে যারা এসেছে, তাদের মধ্যে যার ইচ্ছা সে জুমুআর জন্য অপেক্ষাও করতে পারে, যার ইচ্ছা সে (জুমুআ না পড়েই) ফিরে যেতে পারে।’ প্রাসঙ্গিকভাবে হুযূর (আই.) এ সংক্রান্ত আরও একটি বর্ণনা হাদীস থেকে উদ্ধৃত করেন; একবার জুমুআর দিন ঈদ হওয়ায় হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন যুবায়ের বলেন, ‘একই দিনে দু’টি ঈদ হয়ে গিয়েছে, ঈদ দু’টিকে একত্রে পড়া হবে।’ অতঃপর তিনি দুপুরের পূর্বেই একসাথে দু’রাকাত দু’রাকাত করে ঈদের নামায ও জুমুআ পড়ান; এরপর আসর পর্যন্ত তিনি আর কোন নামায পড়ান নি। হুযূর (আই.) বলেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, কারণ এ বিষয়টি সরাসরি মহানবী (সা.)-এর আমল বা সুন্নত কিংবা খুলাফায়ে রাশেদীনদের আমল থেকে সাব্যস্ত হয় না। এটি তো সাব্যস্ত হয় যে, জুমুআর পরিবর্তে যোহরের নামায পড়া যেতে পারে, কিন্তু ঈদের নামাযের সাথেই আরও দু’রাকাত পড়ে নেয়া হবে এবং যোহরের নামাযও আর পড়তে হবে না- এমন বর্ণনা কেবল এই একটিই রয়েছে।

জুমুআর দিন গোসল করা সংক্রান্ত একটি বর্ণনাও হযরত উসমান (রা.)’র প্রেক্ষাপটে আমরা জানতে পারি। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন হযরত উমর (রা.) জুমুআর খুতবা দিচ্ছিলেন, খুতবা চলাকালে হযরত উসমান (রা.) মসজিদে প্রবেশ করেন। হযরত উমর (রা.) তার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘মানুষজন আযান শোনার পরও কেন দেরি করে নামাযে আসে?’ হযরত উসমান (রা.) তখন বলেন, ‘হে আমীরুল মু’মিনীন, আমি তো আযান শোনার সাথে সাথেই ওযু করেছি চলে এসেছি!’ হযরত উমর বলেন, ‘কেবল ওযু করে? কেন আপনি শোনেন নি যে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের মধ্যে কেউ জুমুআয় আসে, তার উচিত সে যেন গোসল করে আসে’।’ হুযূর (আই.) এখানে ব্যাখ্যা করেন, যদি পানি ও গোসল করার মত সুযোগ থাকে, তাহলে গোসল করে জুমুআয় যাওয়া উচিত।

হাদীসগ্রন্থগুলোতে হযরত উসমান (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অন্য সাহাবীদের তুলনায় অনেক অল্প। তার বর্ণিত মোট হাদীসের সংখ্যা মাত্র ১৪৬, যার মধ্যে তিনটি হাদীস বুখারী ও মুসলিম উভয় গ্রন্থেই বিদ্যমান; বুখারী শরীফে আটটি ও সহীহ্ মুসলিমে তার বর্ণিত পাঁচটি হাদীস রয়েছে। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা কম হওয়ার কারণ হল, তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি বলতেন, হতে পারে যে, অন্য সাহাবীদের চেয়ে আমার স্মরণশক্তি দুর্বল এবং তাদের বর্ণনা সঠিক। সেইসাথে তিনি শপথ করে এ-ও বর্ণনা করেন যে, তিনি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি এমন কোন কথা আরোপ করে যা আমি বলি নি- তাহলে সে জাহান্নামে নিজের ঠিকানা প্রস্তুত করে।’ বস্তুতঃ এটিই তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় কম হওয়ার প্রকৃত কারণ। হযরত আব্দুর রহমান বিন হাতেব (রা.) বলেন, ‘আমি কোন সাহাবীকে হযরত উসমান (রা.)’র চেয়ে বেশি সম্পূর্ণ কথা বর্ণনাকারী পাই নি; তবুও তিনি হাদীস বর্ণনা করতে ভয় পেতেন।’

হযরত উসমান (রা.)’র সহধর্মিণী ও সন্তানদের বিষয়ে জানা যায় যে, তিনি আটটি বিয়ে করেছিলেন, সব বিয়েই ইসলাম গ্রহণের পর করেছিলেন। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন নবী-তনয়া হযরত রুকাইয়্যা (রা.), তার গর্ভে হযরত উসমানের পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন উসমানের জন্ম হয়। দ্বিতীয় স্ত্রী নবী-তনয়া হযরত উম্মে কুলসুম (রা.); তৃতীয় স্ত্রী হযরত উতবাহ্ বিন গাযওয়ানের বোন হযরত ফাখতা বিনতে গাযওয়ান, তার গর্ভে এক পুত্র আব্দুল্লাহ্ জন্ম নেন, তাকে আব্দুল্লাহ্ আল্ আসগার বলে ডাকা হতো। চতুর্থ স্ত্রী হযরত উম্মে আমর বিনতে জুনদুব; তার গর্ভে আমর, খালেদ, আবান, উমর ও মরিয়ম জন্ম নেন। পঞ্চম স্ত্রী হযরত ফাতেমা বিনতে ওয়ালীদ; তার গর্ভে পুত্র ওয়ালীদ, সাঈদ ও কন্যা উম্মে সাঈদের জন্ম হয়। ষষ্ঠ হলেন, হযরত উম্মুল বানীন বিনতে উওয়াইনা, তার গর্ভেও এক পুত্র জন্ম নেন। সপ্তম স্ত্রী ছিলেন হযরত রামলা বিনতে শায়বা, তার গর্ভে তিন কন্যা আয়েশা, উম্মে আবান ও উম্মে আমর জন্ম নেন। অষ্টম স্ত্রী ছিলেন, হযরত নায়লা বিনতে ফারাফিসা; তিনি প্রথমে খ্রিস্টান ছিলেন, রুখসাতানার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিষ্ঠাবতী মুসলমানে পরিণত হন; তার গর্ভে এক কন্যা মরিয়ম ও এক পুত্র আম্বাসাও জন্ম নেন। হযরত উসমান (রা.)’র শাহাদতের সময় তার চারজন স্ত্রী বিদ্যমান ছিলেন, তারা হলেন, হযরত রামলা, হযরত নায়লা, হযরত উম্মুল বানীন ও হযরত ফাখতা; অবশ্য কতক বর্ণনায় একথার সাথে দ্বিমতও করা হয়েছে।

হুযূর (আই.) হযরত খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.) ও হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর কিছু উদ্ধৃতিও উপস্থাপন করেন, যেখানে হযরত উসমান (রা.)’র মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। খলীফাতুল মসীহ্ আউয়াল (রা.) সূরা নূরের ৩৭নং আয়াতের তফসীর করতে গিয়ে প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করেন, হযরত আবু বকর (রা.)’র মাধ্যমে কুরআন সংকলনের মহান কাজ সম্পাদিত হয়েছিল, আর হযরত উমর ও হযরত উসমান (রা.)’র মাধ্যমে কুরআনের প্রচার ও প্রসারের মহান সেবা সম্পাদিত হয়েছিল। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেন, আমার বিশ্বাস হল, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন ও মুসলমান হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈনদের বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে সৃষ্টি না হয়। তারা পৃথিবীর প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ রাখতেন না, বরং তারা নিজেদের জীবন আল্লাহ্‌র পথে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রা.)- সকলেই প্রকৃত অর্থে ধর্মের ক্ষেত্রে ‘আমীন’ বা পরম নিষ্ঠাবান ও বিশ্বস্ত ছিলেন; তারা না থাকলে আমরা কুরআন শরীফের একটি আয়াত সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে পারতাম না যে, সেটি আল্লাহ্‌র বাণী। যারা তাদের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করে, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না, তাদের সম্পর্কে মন্দ কথা ও কর্কশ বাক্য ব্যবহার করে- তিনি (আ.) তাদের ভয়ংকর মন্দ পরিণতির ও ঈমান ধ্বংস হওয়ার বিষয়ে আশংকা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, এই মহান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ আল্লাহ্ তা’লার করুণা ও কৃপালাভের সব দুয়ার বন্ধ করে দেয়। কুরআন সম্পর্কে শিয়াদের জঘন্য অপবাদ যে এটি আল্লাহ্‌র বাণী নয়, বরং (নাউযুবিল্লাহ্) হযরত উসমানের রচনা- সেই অপবাদের খণ্ডনও মসীহ্ মওউদ (আ.) করেছেন। এসব উদ্ধৃতি উপস্থাপন শেষে হুযূর বলেন, আজ হযরত উসমানের স্মৃতিচারণ শেষ হল, আগামীতে হযরত উমর (রা.)’র স্মৃতিচারণ আরম্ভ হবে, ইনশাআল্লাহ্।

হযরত উসমান (রা.)’র স্মৃতিচারণ শেষে হুযূর (আই.) জুমুআর নামাযের পর আল্ ইসলাম কর্তৃক নির্মিত নতুন কুরআন সার্চ ওয়েবাসইটের প্রথম সংস্করণের উদ্বোধনের ঘোষণাও প্রদান করেন যার ওয়েব এড্রেস হল holyquran.io । এতে যে কোন সূরা, আয়াত, শব্দ বা বিষয় আরবী, ঊর্দূ বা ইংরেজিতে খোঁজা যাবে এবং তা আহমদী ও অ-আহমদীদের কৃত অনুবাদসহ দেখা যাবে; এর পরবর্তী সংস্করণ যুক্তরাজ্য জলসা ২০২১ এর পূর্বেই প্রস্তুত হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ্। এছাড়া আল্ ইসলাম ওয়েবসাইটে কুরআন পড়ার ও সার্চ করার ওয়েবপেজ readquran.app এরও নতুন ও সুদৃশ্য সংস্করণ প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে বলে হুযূর জানান, যেখানে ইংরেজি তফসীরসহ তফসীরে সগীরের নোটসমূহের ইংরেজি অনুবাদ, ইংরেজি শব্দার্থ ইত্যাদি সহজলভ্য করা হয়েছে। হুযূর (আই.) দোয়া করেন, এই প্রকল্প বিশ্বব্যাপী কুরআন শরীফের অনিন্দ্য-সুন্দর শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের মাধ্যম হোক এবং জামাতের সদস্যরাও যেন এত্থেকে উত্তমরূপে উপকৃত হন, (আমীন)। সেইসাথে হুযূর পুনরায় পাকিস্তান ও আলজেরিয়ার আহমদীদের জন্য দোয়ার আহ্বান করেন যেন আল্লাহ্ তা’লা তাদের বিপদাপদ দূর করেন আর তাদের জীবন চলার পথ সুগম করেন। (আমীন)

খুতবার শেষাংশে হুযূর (আই.) সম্প্রতি প্রয়াত পনেরজন নিষ্ঠাবান আহমদী সদস্য-সদস্যার গায়েবানা জানাযা পড়ানোর ঘোষণা দেন এবং তাদের সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেন; তারা হলেন যথাক্রমে বাংলাদেশের মোকাররম মোহাম্মদ সাদেক দূর্গারামপুরী সাহেব, রাবওয়া নিবাসী রশীদ আহমদ সাহেবের সহধর্মিণী মোকাররমা মুখতারা বিবি সাহেবা, সাহাবী মিয়া আব্দুল করীম সাহেব (রা.)-এর পুত্র মোকাররম মঞ্জুর আহমদ শাহ্ সাহেব, যুক্তরাষ্ট্রের আব্দুর রহমান সলীম সাহেবের সহধর্মিণী মোকাররমা হামীদা আক্তার সাহেবা, নিষ্ঠাবান জার্মান আহমদী মোকাররম নাসের পিটার লিতসিন সাহেব, রাবওয়া জামেয়ার ভাইস-প্রিন্সিপাল কানাডা প্রবাসী খলীল আহমদ তানভীর সাহেবের সহধর্মিণী মোকাররমা রাজিয়া তানভীর সাহেবা, সারগোধার মিয়াঁ শের মুহাম্মদ সাহেবের পুত্র মোকাররম মিয়াঁ মঞ্জুর আহমদ গালিব সাহেব, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ইয়েমেনের হামীদ আনওয়ার আদন সাহেবের সহধর্মিণী মোহতরমা বুশরা হামীদ আনওয়ার আদনী সাহেবা, কেনিয়ার মুরব্বী সিলসিলাহ্ মুহাম্মদ আফযাল জাফর সাহেবের সহধর্মিণী মোহতরমা নূরুস সুবাহ সাহেবা, আরবী ডেস্কের মুরব্বী মুহাম্মদ আহমদ নঈম সাহেবের পিতা সুলতান আলী রেহান সাহেব, ভারতের মুবাল্লিগ সিলসিলাহ্ মৌলভী গোলাম কাদের সাহেব, কাদিয়ানের দরবেশ মুহাম্মদ আরেফ সাদেক সাহেবের সহধর্মিণী মাহমুদা বেগম সাহেবা, জর্ডান প্রবাসী মিসরের খালেদ সা’দুল্লাহ্ আল্ মিসরী সাহেব, দারুল ফযল রাবওয়ার মোকাররম মুহাম্মদ মুনীর সাহেব এবং দারুল বরকত রাবওয়ার মাস্টার নযীর আহমদ সাহেব। হুযূর তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের পরিবারবর্গ যেন উত্তমরূপে ধৈর্য ধারণ করতে পারেন ও তাদের সৎগুণাবলী ধরে রাখতে পারেন- সেজন্য দোয়া করেন। (আমীন)

Top